বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

হ’পারের মানুষ আবদুল আজিজ খান

শহিদ আহমেদ খান সাবের,সিলেট প্রতিনিধি।
  • Update Time : সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০২২
  • ১৩৬ Time View

শহিদ আহমেদ খান সাবের,সিলেট প্রতিনিধি : আমাদের কিশোর বয়সে সিলেট শহরে বেড়াতে এলে একটি শব্দ প্রায়ই কানে বাজতো। সুরমা নদীর (বিশেষত: কীনব্রীজের) উত্তরপারে অর্থাৎ সিলেট শহরে একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে, ভাই আপনার বাড়ি? প্রত্যুত্তরে অন্যজন বলছে, ‘গাঙ্গর হ’পার’। দেখতাম, প্রশ্নকর্তা জবাবটি শোনার পর অনেকটা নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। বিশেষ কথাবার্তা না বাড়িয়ে নিজের কাজে চলে যেতেন। জবাবটির মধ্যে যে একটা ‘বিশেষ কিছু’ আছে, তা তখন বুঝতে পারিনি। পরে যখন এমসি কলেজে (পূর্বের সরকারী এমসি ইন্টারমেডিয়েট কলেজ, বর্তমান সরকারী কলেজ) ভর্তি হলাম, তখন দেখলাম- শব্দ দু’টির মধ্যে একটা জাদু আছে।

দুই ছাত্রের মধ্যে কোন কিছু নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে, একজন যখনই বললো, তার বাড়ি ‘গাঙ্গর হ’পার’ তখনই জাদুমন্ত্রের মতো অপরজন নিজেকে গুটিয়ে নিতো, হোক সে সিলেট শহরের, নয় তো অন্য কোন জেলা বা থানার লোক। আস্তে আস্তে শব্দ দু’টির মহাত্ম বুঝতে পারলাম। দক্ষিণ সুরমার খিত্তা পরগনা, বিশেষত: বরইকান্দি, মোল্লারগাঁও, কুচাই ও তেতলী ইউনিয়নের অধিবাসীগণ ‘হ’পার-এর লোক হিসেবে গণ্য হতেন। কলেজ জীবনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে (মারামারির উপক্রম হলে) আমরা যারা একটু দূরের লোক (যেমন আমি দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নের অধিবাসী) তারা আত্মরক্ষার্থে কিংবা প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে নিজেদের ‘হ’পার’-এর লোক হিসেবেই পরিচয় দিতাম।

জনাব আব্দুল আজীজ খান এই হ’পারেরই লোক। কদমতলী সংলগ্ন পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা। ‘হ’পার’ শব্দটির মতোই আব্দুল আজীজ খান সাহেবের নামও সেই কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে প্রথম শুনি। পরে জানতে পারি, তিনি দক্ষিণ সুরমা এলাকার একজন বিশিষ্ট মুরব্বী, সালিশী ব্যক্তিত্ব, এলাকার জনপ্রতিনিধি (কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান), বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী সর্বোপরী একজন ইসলাম দরদী লোক। নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে তিনি অনেক কিছু করেছেন।একটি প্রবাদ আছে, ‘প্রদীপের নীচে অন্ধকার’। সিলেট শহরতলী হিসেবে দক্ষিণ সুরমা এলাকাও দীর্ঘদিন পর্যন্ত অবহেলিত ছিল। ভাল কোন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ছিল না। সাত মাইল দক্ষিণের লালাবাজার হাইস্কুল আর পাঁচ মাইল পূর্বের কুচাই ইছরাব আলী হাইস্কুলই ছিল বর্তমান দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মাধ্যমিক স্তরের দুটি মাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোন কলেজ বা মাদ্রাসা ছিল না।

রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভাল ছিল না। দীর্ঘদিন পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ, টেলিফোন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের পায়ে হেঁটে- কীনব্রীজ পাড়ি দিয়ে, না হয় খেয়া নৌকায় সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে গভর্নমেন্ট পাইলট হাইস্কুল না হয় রাজা স্কুলে (রাজা জিসি হাইস্কুল) এসে পড়াশোনা করতে হতো। এ অবস্থায় এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট লাঘবার্থে আব্দুল আজীজ খান সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন গোটাটিকর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজীবন এই প্রতিষ্ঠানের সেবা করে গেছেন। এর উন্নতির জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন। সিলেট অঞ্চলের নারী শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান সিলেট মহিলা কলেজের (বর্তমান সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ) সাথে তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত জড়িত ছিলেন।

এ কলেজের এক সময়কার অধ্যাপক, পরবর্তীতে সিলেট শহরের স্বনামধন্য মদন মোহন কলেজের দীর্ঘদিনের প্রিন্সিপাল, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রয়াত কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় আব্দুল আজীজ খান সাহেবের অবদানের কথা অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন ‘১৯৫১ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই ডুবুডুবু কলেজের হাল বিশেষভাবে ধরেছিলেন অধ্যক্ষ গিরীন্দ্র চন্দ্র দত্ত। তাঁর অন্যতম প্রধান সহায়ক ছিলেন অফিস কারনিক জনাব আব্দুল আজীজ খান। গিরীন্দ্র ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ীতে একটি ছোট কক্ষে উভয়ে বসতেন। এটিই ছিল অধ্যক্ষের কক্ষ এবং এটিই ছিল কলেজ অফিস। সেখানে বসে দিনরাত দু’জনে অফিসের কাজ করতেন। তাঁর ‘আজীজ’ ডাকের মধ্যে একটা সম্মোহনী মমতার সুর ফুটে উঠতো এবং আজীজ খানও সবকিছু ভুলে গিয়ে ছায়ার মত তাঁর অনুসরণ করতেন। কখন কলেজে এসেছেন এবং কখন বাড়ী ফিরবেন সেটি বড় কথা নয়।

প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হয়েছে কিনা সেটিই ছিল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য।’ (জীবন স্মৃতির কিছু কথা, কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী, দৈনিক জালালাবাদ ২৬ আগস্ট ১৯৯৫) আব্দুল আজিজ খান সাহেব তাঁর এ অভিজ্ঞতা-ই পরবর্তীতে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত দাখিল মাদ্রাসার উন্নয়নের কাজে লাগিয়েছেন। এছাড়াও নিজ এলাকার জনগণের সুবিধার্থে ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম অবদান। খান সাহেবের আরেকটি অবদান তিনি একজন পরিবেশবাদী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকায় (বিশেষত: ঈদগাহ এবং পারিবারিক গোরস্থানে) প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন। আমরা সাধারণত বৃক্ষপ্রেমীদের বনজ গাছ লাগাতে দেখি। খান সাহেব এ দিক থেকে ব্যতিক্রমী। তিনি ফলজ গাছকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর মতে, ফলজ গাছে ফল হবে, এ ফল মানুষের সাথে সাথে পশু পাখিও খাবে। এতে করে বৃক্ষ রোপনকারী সদগায়ে জারিয়ার সোয়াব পাবেন।

তাঁর মানবপ্রেমের আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত পড়াশোনার জন্য সকলকে উৎসাহিত করা। এমনকি বাড়ির কাজের লোকদেরও তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহিত করতেন। আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া, মুসাফির ও বিপদগ্রস্তদের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, নও-মুসলিমদের প্রতিষ্ঠা করা সহ সকল মানবিক ও জনহিতকর কাজে তিনি ছিলেন সকলের অগ্রণী। তিনি রাজনীতি সচেতনও ছিলেন। একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে সিলেট রেফারেন্ডামেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এলাকার নিপীড়িত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে, তাদের সহায়-সম্পদ, সম্ভ্রম রক্ষার্থে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এজন্য তাঁকে পাক সেনাদের দ্বারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে।

তাঁর এ সাহসিকতার পেছনে তাঁর রক্ত ও বংশধারাটি কাজ করেছে। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন আফগানিস্তানের অধিবাসী পাঠান বীর সুবানী খাঁ (যার নামে সিলেট শহরের সুবহানীঘাটের নামকরণ)। তিনি তাঁর অধ:স্তন। আব্দুল আজিজ খান সাহেব একজন সফল পিতাও। তিনি দশ সন্তানের পিতা। চার ছেলে ও ছয় মেয়ে। এঁরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সিলেটের বিদ্বৎসমাজে দুই সুপরিচিত নাম ফরিদ আহমদ রেজা (বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী) এবং ডক্টর হুমায়ুন কবীর (ঢাকার এক কলেজের প্রিন্সিপাল) তাঁর দুই জামাতা। খান সাহেবের বর্তমান বয়স প্রায় পঁচাশি। স্মৃতি শক্তি অনেকটাই নেই। দুইবার ষ্টোক হওয়ার কারণে বর্তমানে শয্যাশায়ী। তিনি সুস্থ থাকাবস্থায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা গেলে তাঁর নিকট থেকে সিলেট শহর ও শহরতলীর অনেক আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করা যেতো, যা বর্তমান জেনারেশনের জন্য হতো শিক্ষনীয়। কিন্তু আফসোস, সে সুযোগ আর নেই।

আমরা আব্দুল আজীজ খান সাহেবের সুস্থতা কামনা করি। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সমস্ত নেক কাজ কবুল করুন। আমীন হ’পারের মানুষ আবদুল আজিজ খান আমাদের কিশোর বয়সে সিলেট শহরে বেড়াতে এলে একটি শব্দ প্রায়ই কানে বাজতো। সুরমা নদীর (বিশেষত: কীনব্রীজের) উত্তরপারে অর্থাৎ সিলেট শহরে একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে, ভাই আপনার বাড়ি? প্রত্যুত্তরে অন্যজন বলছে, ‘গাঙ্গর হ’পার’। দেখতাম, প্রশ্নকর্তা জবাবটি শোনার পর অনেকটা নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। বিশেষ কথাবার্তা না বাড়িয়ে নিজের কাজে চলে যেতেন। জবাবটির মধ্যে যে একটা ‘বিশেষ কিছু’ আছে, তা তখন বুঝতে পারিনি। পরে যখন এমসি কলেজে (পূর্বের সরকারী এমসি ইন্টারমেডিয়েট কলেজ, বর্তমান সরকারী কলেজ) ভর্তি হলাম, তখন দেখলাম- শব্দ দু’টির মধ্যে একটা জাদু আছে। দুই ছাত্রের মধ্যে কোন কিছু নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে, একজন যখনই বললো, তার বাড়ি ‘গাঙ্গর হ’পার’ তখনই জাদুমন্ত্রের মতো অপরজন নিজেকে গুটিয়ে নিতো, হোক সে সিলেট শহরের, নয় তো অন্য কোন জেলা বা থানার লোক। আস্তে আস্তে শব্দ দু’টির মহাত্ম বুঝতে পারলাম। দক্ষিণ সুরমার খিত্তা পরগনা, বিশেষত: বরইকান্দি, মোল্লারগাঁও, কুচাই ও তেতলী ইউনিয়নের অধিবাসীগণ ‘হ’পার-এর লোক হিসেবে গণ্য হতেন। কলেজ জীবনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে (মারামারির উপক্রম হলে) আমরা যারা একটু দূরের লোক (যেমন আমি দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নের অধিবাসী) তারা আত্মরক্ষার্থে কিংবা প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে নিজেদের ‘হ’পার’-এর লোক হিসেবেই পরিচয় দিতাম।
জনাব আব্দুল আজীজ খান এই হ’পারেরই লোক। কদমতলী সংলগ্ন পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা। ‘হ’পার’ শব্দটির মতোই আব্দুল আজীজ খান সাহেবের নামও সেই কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে প্রথম শুনি। পরে জানতে পারি, তিনি দক্ষিণ সুরমা এলাকার একজন বিশিষ্ট মুরব্বী, সালিশী ব্যক্তিত্ব, এলাকার জনপ্রতিনিধি (কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান), বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী সর্বোপরী একজন ইসলাম দরদী লোক। নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে তিনি অনেক কিছু করেছেন।

একটি প্রবাদ আছে, ‘প্রদীপের নীচে অন্ধকার’। সিলেট শহরতলী হিসেবে দক্ষিণ সুরমা এলাকাও দীর্ঘদিন পর্যন্ত অবহেলিত ছিল। ভাল কোন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ছিল না। সাত মাইল দক্ষিণের লালাবাজার হাইস্কুল আর পাঁচ মাইল পূর্বের কুচাই ইছরাব আলী হাইস্কুলই ছিল বর্তমান দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মাধ্যমিক স্তরের দুটি মাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোন কলেজ বা মাদ্রাসা ছিল না। রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভাল ছিল না। দীর্ঘদিন পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ, টেলিফোন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের পায়ে হেঁটে- কীনব্রীজ পাড়ি দিয়ে, না হয় খেয়া নৌকায় সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে গভর্নমেন্ট পাইলট হাইস্কুল না হয় রাজা স্কুলে (রাজা জিসি হাইস্কুল) এসে পড়াশোনা করতে হতো।

এ অবস্থায় এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট লাঘবার্থে আব্দুল আজীজ খান সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন গোটাটিকর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজীবন এই প্রতিষ্ঠানের সেবা করে গেছেন। এর উন্নতির জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
সিলেট অঞ্চলের নারী শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান সিলেট মহিলা কলেজের (বর্তমান সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ) সাথে তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত জড়িত ছিলেন। এ কলেজের এক সময়কার অধ্যাপক, পরবর্তীতে সিলেট শহরের স্বনামধন্য মদন মোহন কলেজের দীর্ঘদিনের প্রিন্সিপাল, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রয়াত কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় আব্দুল আজীজ খান সাহেবের অবদানের কথা অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন।

তিনি লিখেছেন ‘১৯৫১ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই ডুবুডুবু কলেজের হাল বিশেষভাবে ধরেছিলেন অধ্যক্ষ গিরীন্দ্র চন্দ্র দত্ত। তাঁর অন্যতম প্রধান সহায়ক ছিলেন অফিস কারনিক জনাব আব্দুল আজীজ খান। গিরীন্দ্র ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ীতে একটি ছোট কক্ষে উভয়ে বসতেন। এটিই ছিল অধ্যক্ষের কক্ষ এবং এটিই ছিল কলেজ অফিস। সেখানে বসে দিনরাত দু’জনে অফিসের কাজ করতেন। তাঁর ‘আজীজ’ ডাকের মধ্যে একটা সম্মোহনী মমতার সুর ফুটে উঠতো এবং আজীজ খানও সবকিছু ভুলে গিয়ে ছায়ার মত তাঁর অনুসরণ করতেন। কখন কলেজে এসেছেন এবং কখন বাড়ী ফিরবেন সেটি বড় কথা নয়। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হয়েছে কিনা সেটিই ছিল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য।’ (জীবন স্মৃতির কিছু কথা, কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী, দৈনিক জালালাবাদ ২৬ আগস্ট ১৯৯৫)

আব্দুল আজিজ খান সাহেব তাঁর এ অভিজ্ঞতা-ই পরবর্তীতে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত দাখিল মাদ্রাসার উন্নয়নের কাজে লাগিয়েছেন। এছাড়াও নিজ এলাকার জনগণের সুবিধার্থে ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম অবদান। খান সাহেবের আরেকটি অবদান তিনি একজন পরিবেশবাদী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকায় (বিশেষত: ঈদগাহ এবং পারিবারিক গোরস্থানে) প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন। আমরা সাধারণত বৃক্ষপ্রেমীদের বনজ গাছ লাগাতে দেখি। খান সাহেব এ দিক থেকে ব্যতিক্রমী। তিনি ফলজ গাছকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর মতে, ফলজ গাছে ফল হবে, এ ফল মানুষের সাথে সাথে পশু পাখিও খাবে। এতে করে বৃক্ষ রোপনকারী সদগায়ে জারিয়ার সোয়াব পাবেন।

তাঁর মানবপ্রেমের আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত পড়াশোনার জন্য সকলকে উৎসাহিত করা। এমনকি বাড়ির কাজের লোকদেরও তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহিত করতেন। আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া, মুসাফির ও বিপদগ্রস্তদের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, নও-মুসলিমদের প্রতিষ্ঠা করা সহ সকল মানবিক ও জনহিতকর কাজে তিনি ছিলেন সকলের অগ্রণী। তিনি রাজনীতি সচেতনও ছিলেন। একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে সিলেট রেফারেন্ডামেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এলাকার নিপীড়িত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে, তাদের সহায়-সম্পদ, সম্ভ্রম রক্ষার্থে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এজন্য তাঁকে পাক সেনাদের দ্বারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে।

তাঁর এ সাহসিকতার পেছনে তাঁর রক্ত ও বংশধারাটি কাজ করেছে। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন আফগানিস্তানের অধিবাসী পাঠান বীর সুবানী খাঁ (যার নামে সিলেট শহরের সুবহানীঘাটের নামকরণ)। তিনি তাঁর অধ:স্তন। আব্দুল আজিজ খান সাহেব একজন সফল পিতাও। তিনি দশ সন্তানের পিতা। চার ছেলে ও ছয় মেয়ে। এঁরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সিলেটের বিদ্বৎসমাজে দুই সুপরিচিত নাম ফরিদ আহমদ রেজা (বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী) এবং ডক্টর হুমায়ুন কবীর (ঢাকার এক কলেজের প্রিন্সিপাল) তাঁর দুই জামাতা। খান সাহেবের বর্তমান বয়স প্রায় পঁচাশি। স্মৃতি শক্তি অনেকটাই নেই। দুইবার ষ্টোক হওয়ার কারণে বর্তমানে শয্যাশায়ী। তিনি সুস্থ থাকাবস্থায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা গেলে তাঁর নিকট থেকে সিলেট শহর ও শহরতলীর অনেক আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তথ্য্সংরগ্রহ করা যেতো, যা বর্তমান জেনারেশনের জন্য হতো শিক্ষনীয়। কিন্তু আফসোস, সে সুযোগ আর নেই। আমরা আব্দুল আজীজ খান সাহেবের সুস্থতা কামনা করি। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সমস্ত নেক কাজ কবুল করুন। আমীন

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২১ নভেম্বর ২০২২,খ্রিস্টাব্দ/রাত ৮:৫১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit