নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি : বাংলা সিনেমা আয়নাবাজিতে দেখা যায় আসামী বদলের গল্প। সেই সিনেমার গল্পটিই যেনো বাস্তবতায় ধরা দিলো নরসিংদীতে। মানবপাচার মামলায় আসামি সেলিম, কিন্তু ‘ভাড়ায়’ জেল খাটলেন হারুন নরসিংদীর মানবপাচার ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনা ঘটেছে।
মানবপাচার মামলার এক আসামির পক্ষে ‘ভাড়ায়’ অন্য একজনের জেল খাটার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর আদালত মানবপাচার মামলায় ‘ভাড়া খাটা’ ব্যক্তিকে জামিন দিয়েছে। কিন্তু জামিনে কারামুক্তি পরই মঙ্গলবার প্রতারণার মামলায় আবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অপরদিকে মানবপাচার মামলার প্রকৃত আসামি সোমবার আত্মসমর্পণ করলে তাকেও কারাগারে পাঠিয়েছে। ভাড়ায় জেল খাটা ব্যক্তির নাম হারুন মিয়া (৫২)। তিনি রায়পুরা থানার মাহমুদনগর এলাকার সামছু মিয়ার ছেলে। তিনি মানবপাচার মামলায় মোট এক মাস ছয় দিন কারাগারে ছিলেন। আর প্রকৃত আসামি সেলিম (৩৫) একই এলাকার জসিম উদ্দিনের ছেলে।
মামলার বরাতে নরসিংদীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শিরীন আক্তার শেলী বলেন, ২০২৪ সালে মামলাটি করেছেন রায়পুরা থানার বীরকান্দির হাইরমারা এলাকার মনির মিয়ার স্ত্রী সাবিনা আক্তার। মামলায় তিনি তার স্বামীকে পাচারের অভিযোগ এনেছেন। এতে মাহমুদনগর এলাকায় আয়েস আলীর ছেলে জমিরকে (৩৮) প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য দুই আসামি হলেন- একই এলাকার সেলিম এবং জমিরের স্ত্রী ফাতেমা (৩২)।
আইনজীবী বলেন, এই মামলায় ১২ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন জামির, সেলিম ও ফাতেমা। শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পুলিশ আসামিদের নিয়ে কারাগারে চলে যায়। তিনি বলেন, “আদালত থেকে ফিরে আসার পর আমরা জানতে পারি, সেদিন সেলিমের পরিবর্তে হারুন সারেন্ডার করেছেন। হারুন দুই নম্বর আসামি সেলিমের হয়ে ‘প্রক্সি’ দিতে আসছেন। সেলিম জেল হাজতে যাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আদালতকে অবগত করা হয়। “বিগত দিনে আমরা এরকম দেখেছি, টাকার বিনিময়ে ‘প্রক্সি’ দিয়ে অন্য একজন জেল খাটছেন। বিষয়টি জানার পর আদালত তদন্তের আদেশ দেন।”
আইনজীবী বলেন, “আমি নিজেও বাদীকে ডেকে বিষয়টি জিজ্ঞাস করি। বাদী তখন আমাকে বলেন, সেটি তার শ্বশুরবাড়ির এলাকা, ফলে তিনি সবাইকে ঠিকঠাক চেনেন না। “যাই হোক, বিষয়টি জানার পর বিচারক মুহাম্মদ আলী আহসান ‘ভাড়ায় খাটা আসামি’ হারুনকে জামিন দিয়েছেন। আজকে এক মাস ছয় দিন জেল খেটে হারুন জামিন মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু যেহেতু এটা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ‘প্রক্সি’ দিয়েছেন, ফলে উনার বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মামলা হয়েছে। নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর পরই পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করেছে।”
আইনজীবী বলেন, প্রকৃত আসামি সেলিমও সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীই তাকে সারেন্ডার করিয়েছেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। এখন এটি তদন্ত হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, মামলার অন্য দুই আসামি জামির ও তার স্ত্রী ফাতেমা জামিনে আছেন। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশে নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. তারেক কামাল চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল আদালতে যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, বন্দিকে কারাগারে গ্রহণের সময় নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি তার নাম হারুন বলে জানান। কিন্তু আসামি হিসেবে সেলিমের নাম লিপিবদ্ধ আছে।
জেল সুপারের চিঠি পাওয়ার পর আদালত বিষয়টি তদন্ত করতে রায়পুরা থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। তখন থানার এসআই মো. যুবায়ের হোসেন বিষয়টি তদন্ত করে চলতি বছরের ১১ মে আদালতে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতেও সেলিম ও হারুন দুজন ভিন্ন ব্যক্তি বলে চিহ্নিত করা হয়। তাতে বলা হয়, মানবপাচার মামলায় জামির, সেলিম ও ফাতেমা ছাড়া অন্য কোনো আসামি নেই।
এরপর এসআইয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে নরসিংদীর মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান, অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো. গোলাম মাসুম রায়পুরা থানায় হারুনের বিরুদ্ধে প্রতারণা, আদালতকে বিভ্রান্ত করা ও জালিয়াতির অভিযোগ এনে মামলা করেন। সেই মামলাতেই হারুনকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে আইনজীবী জানান। হারুন মিয়া কারা ফটকে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার শ্যালক জামির আমাকে আদালতে নিয়ে আসেন। পরে জামিন না হওয়ায় তিনি পালিয়ে যান। এরপর আমাকে সেলিম মনে করে কারাগারে পাঠানো হয়।”
কিউএনবি/আয়শা/ ১৯ মে ২০২৬,/রাত ৯:১৫