শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ পূর্বাহ্ন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, অগ্নিপরীক্ষায় পাকিস্তান

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৯ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসলামাবাদে এখন সাজ সাজ রব। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি টেকসই শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে পাকিস্তান। শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনব্যাপী এই শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। যদিও আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবে পাকিস্তান এই আয়োজন সম্পন্ন করতে কোনো কমতি রাখছে না। সারা বিশ্বের নজর এখন এই আলোচনার দিকে, কারণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই এই আলোচনার সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শান্তি প্রচেষ্টা পাকিস্তানের জন্য কেবল কূটনৈতিক মর্যাদার লড়াই নয় বরং অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন পরীক্ষাও। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং অঞ্চলটি কোনো বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে পাকিস্তান একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। গত বছর সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করার পর পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই অঙ্গীকার রক্ষা করবে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার এই জটিল সমীকরণে পাকিস্তান যদি কোনো এক পক্ষ নিতে বাধ্য হয়, তবে তাদের প্রতিবেশী ইরান, আফগানিস্তান এবং ভারত; তিনটি সীমান্তই একসাথে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অভ্যন্তরীণভাবে বিদ্রোহ মোকাবিলা করা পাকিস্তানের জন্য এটি হবে এক অসহনীয় চাপ।

তবে বর্তমানে দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনার চেয়ে গর্বের আবহ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, বিশ্ব যখন একটি বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন পাকিস্তান এককভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ঋণের দায়ে জর্জরিত পাকিস্তানের জন্য এটি একটি বিশাল বড় সাফল্য। কোনো বড় শক্তি যা করতে পারেনি, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি সেই অসাধ্য সাধন করে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে। এই সফলতার পেছনে দেশটির সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত প্রচেষ্টাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

শান্তি আলোচনার এই পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তার সাথে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে ট্রাম্পের বিশেষ আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন মুনির। ট্রাম্প তার প্রথম কংগ্রেস ভাষণেও এই সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া ভারতের সাথে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে ট্রাম্পের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে পাকিস্তান তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও এই আলোচনায় বড় ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান তাদের খনিজ সম্পদ উত্তোলনে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসার সাথে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সাথেও পাকিস্তান চুক্তি করেছে। এই কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পাকিস্তান ওয়াশিংটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তবে এই ঘনিষ্ঠতা ইরান বা অন্য আরব দেশগুলোর সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি। 

ইরানের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান অত্যন্ত কৌশলী এবং নীতিগত অবস্থান বজায় রেখেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কঠোর নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে হামলার ঘটনায় ইরানের বিরুদ্ধেও তারা শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। এই নিরপেক্ষ অবস্থানই ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ গত কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো এবং তেহরানের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। বিশেষ করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে তার সাম্প্রতিক আলাপচারিতা এই শান্তি আলোচনার পথকে আরও সুগম করেছে।

সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটও এই মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সুন্নি প্রধান দেশ হলেও পাকিস্তানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিয়া জনগোষ্ঠী বাস করে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার পাকিস্তানি ইরানে তীর্থযাত্রায় যান। এছাড়া আফগান শরণার্থী সমস্যা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত সহযোগিতা রয়েছে। এই ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় নৈকট্য ইরানকে পাকিস্তানের ওপর ভরসা করতে উৎসাহিত করেছে। পাকিস্তান এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে দুই প্রবল প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে।

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বিশেষ করে লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা। পাকিস্তান মনে করে, এই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে হলে ট্রাম্পকে অবশ্যই ইসরায়েলকে সংযত করতে হবে। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তারা ঘোড়াকে জল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন, কিন্তু জল পান করা না করা এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করছে। আপাতত পুরো বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ইসলামাবাদের এই আলোচনার ফলাফলের জন্য, যা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে।

বিবিসির বিশ্লেষণ

কিউএনবি/অনিমা/১০ এপ্রিল ২০২৬,/রাত ১১:২৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

April 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit