নরসিংদীতে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ ও হত্যা, রহস্য উদঘাটন
Reporter Name
Update Time :
সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
২৩০
Time View
মোঃ সালাহউদ্দিন আহমেদ,নরসিংদী : নরসিংদীর মনোহরদীতে অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে সুমন হোসেন (২৪) নামের এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত শাহনাজ আক্তার পপি (২৮), তার স্বামী আব্দুল বাতেন ও কাকন খান নামে প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ির মিঠালু গ্রামে এবং নরসিংদীতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পপি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি এলাকার গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। দুই সন্তানের জননী ওই নারী শ্রীপুরের রাজাবাড়ি এলাকার একটি কম্পোজিট কারখানার একজন সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। তিনি ফেসবুকে কমবয়সী সুশ্রী নারীর ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করে সুমনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতেন। বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান, বাবুরহাটের শাড়ি সম্পর্কে ধারণা নিতে গত বুধবার প্রথমবারের মতো নরসিংদীতে আসার কথা তার পরিবারের সদস্যরা জানলেও আসলে সুমন এসেছিলেন ওই নারীর প্রলোভনে। নির্দিষ্ট স্থানে আসার পরই তাকে অপহরণ করে আটকে রেখে এক লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে তার মৃত্যু হলে লাশ মনোহরদীর একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগলিয়াপাড়া গ্রামের রূপচানের বাড়ির খড়ের গাদার নিচে ফেলে রাখা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে সুমন হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত সুমনের পিঠে, গলায় ও চোখের নিচে রক্তাক্ত জখম ছিল। এছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখে ওই রাতেই সিরাজগঞ্জ থেকে সুমন হোসেনের পরিবারের সদস্যরা মনোহরদী থানায় আসেন। মনোহরদী থানায় গিয়ে ছবি দেখে মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। এই হত্যার রহস্য উদঘাটনে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মাঠে নামে নরসিংদী জেলা পুলিশ। পরে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে ওই রাতেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন নিহতের বড় বোন মিনু আক্তার। নিহত সুমন হোসেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রায়পুর এলাকার মৃত মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। তিনি সিরাজগঞ্জের একটি ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করতেন। পুলিশ সুপার বলেন, নিহত সুমনের ফোনকলের সিডিআর সংগ্রহ করে জানতে পারে, সিরাজগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে নরসিংদী আসার পথে শাহানাজ আক্তার ওরফে পপি নামের ওই নারীর সঙ্গে তার অনেকবার কথোপকথন হয়।
এর সূত্র ধরে আজ ভোরে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর সুমনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে ঘটনার বিস্তারিত আমাদের জানায়। অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করে এমন একটি চক্রের সদস্য পপি আর তার স্বামী বাতেন ও সহযোগী কাকন। এই শাহানাজ আক্তারই তাকে নরসিংদীতে আসতে বলেছল। পরে তাকে শিবপুরের দুলালপুরের আশুটিয়া পূর্বপাড়ার একটি গোপন স্থানে আটকে রেখে নির্যাতনের পর এক লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। মুক্তিপণের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে হত্যা করে লাশ পার্শ্ববর্তী মনোহরদীর একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগলিয়াপাড়া গ্রামের রূপচানের বাড়ির খড়ের গাদার নিচে ফেলে রাখা হয়। সুমনকে অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে পরে তাকে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। শাহনাজ আক্তার পপির নেতৃত্বে আরও তিন/চারজনের একটি প্রতারক চক্র রয়েছে। পপি বিভিন্ন লোকদের ফেসবুকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সুন্দরী মেয়ের ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দেখা করতে বলত।
তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ওই চক্রের অন্য সদস্যরা তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করত। সুমনকে এভাবেই ফাঁদে ফেলে নরসিংদীতে ডেকে আনা হয়েছিল। মুক্তিপণ না দেওয়ায় সহযোগী প্রতারক চক্রের সদস্যদের হাতে খুন হয় সুমন। এই ঘটনায় জড়িত চক্রটির অন্য সদস্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। সেই সাথে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে আরও তথ্যের জন্য আদালতে কাছে তাদের রিমান্ড চাইবে বলে জানায় পুলিশ। এদিকে শাহানাজ আক্তার ওরফে পপি জানান, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে পর্নো ভিডিও ছেড়ে উঠতি বয়সের ছেলেদের ফাঁদে ফেলেন তারা। তিনি জানান, মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন ছেলেদের পর্নো ভিডিও দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা না দিলে তাদের গ্রুপের সদস্য হানিফ, কাকন ও বাতেনসহ বেশ কয়েকজন তাদের র্নিযাতন করে পরিবারে কাছ থেকে টাকা আনার জন্য। পপি বলেন, গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আমার মুঠোফোনে কল করে দেখা করতে চান সিফাত নামের এক ব্যক্তি। পরে ৭ তারিখে তিনি শ্রীপুরে এসে দেখা করে আমার হাতে ৩ হাজার টাকা দিয়ে বলেন, একটা কাজ করে দিলে আরও ১০ হাজার টাকা দেব।
কী কাজ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে তাকে নরসিংদী নিয়ে আসতে হবে। আমি টাকার লোভে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। সিফাতের সঙ্গে এই পর্যন্ত আমার দুইবার কথা হয়েছে। পরে জানতে পারি সিফাতদের কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ আছে, যেখানে পর্নো ভিডিও ছাড়া হয়। তাদেরই একটি গ্রুপে নক দিয়েছিল সুমন হোসেন। গ্রুপের মেসেঞ্জার চ্যাটে সুমন সঙ্গে কথা বলত তারা কিন্তু মোবাইলে কথা বলতাম আমি। আমি সুমন নামে আর হানিফকে সিফাত নামে চিনতাম। পরে আমি সুমনকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে একসঙ্গে তিনদিন থাকার প্রস্তাব দিলে সে রাজী হয়ে যায়। কথাবার্তার একপর্যায়ে গত বুধবার সকালে আমার সঙ্গে তিনদিন থাকার জন্যই সিরাজগঞ্জ থেকে নরসিংদীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় সুমন। সিফাতের কাছ থেকে ঠিকানা জেনে নিয়ে আমি সুমনকে বলেছিলাম নরসিংদীর শিবপুরের দুলালপুর এলাকার আশুটিয়াপাড়ায় চলে আসতে। আমি শ্রীপুরে থেকেই তার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকি। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ওই এলাকায় যাওয়ার পর তার সঙ্গে যখন আমার সর্বশেষ কথা হয়, সে আমাকে বলেছিল আমি তোমার দেওয়া ঠিকানায় চলে এসেছি।
এরপরই আমি সিফাতের মোবাইলে কল করি, কল ধরে সিফাত জানায়, সে চলে আসছে। আমি পরে তোমাকে কল দেব এই কথা বলে তিনি কল কেটে দেন। এরপর তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় আর আমাদের কথা হয়নি। তিনি আরও বলেন, আরও ১০ হাজার টাকার লোভে আমি শুধু সুমনকে কৌশলে নরসিংদীতে এনে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। এছাড়া সিফাতের আরেক নাম যে হানিফ, এটা আমি জানতাম না। শুধু জানতাম, তার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরের আশুটিয়াপাড়ায়। সুমনকে কী কারণে নরসিংদীতে আনা হয়েছে তাও জানতাম না। পরে জেনেছি তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতে চেয়েছিল তারা। পরে মুক্তিপণ না পেয়ে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে সিফাতরা। শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সিফাত আমাকে অন্য একটি মুঠোফোন থেকে কল দিয়ে জানায়, সাবধানে থাইকো। কেন জানতে চাইলে সে জানায়, সুমন মারা গেছে। আজ ভোরে যখন আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে আসে, তারপর পুরো ঘটনা জানতে পারি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুমনের বাবা ছয় মাস আগে মারা গেছেন। তাঁর মা-ও দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত। বাবার মৃত্যুর পর থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন মিঠু।
স্থানীয় বিভিন্ন হাট থেকে শাড়ি সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করলেও, নরসিংদীর বাবুরহাটের কাপড় বিক্রির ইচ্ছা ছিল তার। এই জন্য গত বুধবার সকালে সিরাজগঞ্জ থেকে নরসিংদীর উদ্দেশে রওনা হন। ঢাকায় পৌঁছার পর তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে দুপুরের খাবার খান। পরে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে নরসিংদী পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের কাছে কল করে ঠিকঠাক পৌঁছানোর খবর জানান। তবে নরসিংদীতে ঠিক কাদের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, তা কেউ জানতেন না। নিহতের পরিবার জানায়, ফেসবুকে পরিচয় হওয়া দুই বন্ধুর ভরসায় গত বুধবার সন্ধ্যায় নরসিংদীতে আসার পর অপহরণের শিকার হন তিনি। ওইদিন রাত প্রায় ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অন্তত ৫০ বার সুমনের মুঠোফোন থেকে কল করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ চান তারা। এমন কি হত্যাকাণ্ডের পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে যখন পুলিশ সুমনের লাশ উদ্ধার করছিল তখনও মুক্তিপণের টাকা চেয়েছিল অপহরণকারীরা।