বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন ৪৬৯ শিক্ষার্থী, তালিকা প্রকাশ ১০১ ডলার ছাড়াল তেলের দাম বিদায়ী ভাষণে আবেগাপ্লুত মেসি যা বললেন প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনে ২২ জেলায় হচ্ছে ‘শিশু স্বর্গ’: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রাজু হত্যা মামলায় সাবেক এমপি মোশতাক রুহী ৪ দিনের রিমান্ডে রোহিঙ্গা সংকটে টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেডারেশন কাপে দারুণ শুরু বসুন্ধরা কিংসের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে চায় ভারত বন্ধুদের সঙ্গে না পেরে ভিন্ন চেষ্টা, ‘গোপন প্রতিভা’ ফাঁস করলেন জাহ্নবী আদালত থেকে পালালেন আসামি, কনস্টেবল বরখাস্ত

রামিসার জন্য কাঁদছে বাংলাদেশ, কুলখানিতে অংশ নিতে গ্রামে পরিবার

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ৫৭ Time View

ডেস্কনিউজঃ ঢাকার আকাশ আজও ভারী। সকাল গড়িয়ে দুপুর ১২টা হলেও রাজধানীর মিরপুরে ছোট্ট রামিসাদের বাসার সামনে মানুষের ঢল কমেনি। চোখে-মুখে ক্ষোভ আর শোক নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন পল্লবীর বাসিন্দারা। এলাকাজুড়ে একটাই দাবি— দোষীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

অপরাধীদের বিচারের দাবিতে যখন পল্লবীবাসীর ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই সাত বছর বয়সী রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হন পরিবারের সদস্যরা। কয়েকদিন পরই হয়তো বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে ঈদুল আজহা উদযাপনের জন্য বাড়ি ফেরার কথা ছিল ছোট্ট রামিসার। কিন্তু এবারের ঈদে আর ফেরা হবে না তার।

বাবা-মায়ের এবারের যাত্রাও আনন্দের নয়, বেদনার। পরিবার নিয়ে এ যাত্রা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির নয়; বরং প্রিয়জনকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে কুলখানিতে অংশ নেওয়ার যাত্রা। যে শিশুটি ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল, সেই রামিসাকে ঘিরেই এখন স্বজনদের কান্না আর বিচার দাবিতে মানুষের ক্ষোভ।

শুক্রবার (২২ মে) রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় নিহত শিশু রামিসার বাসার সামনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই রামিসার বাসার সামনের সড়কটি যেন শোক আর ক্ষোভের এক প্রতিবাদমঞ্চে পরিণত হয়েছে। বাসার সামনে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্করাও অংশ নেন বিক্ষোভে। স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় তাদের।

এদিকে, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ চলার মধ্যেই দুপুর ১২টার দিকে রামিসার পরিবারকে একটি প্রাইভেটকারে করে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হতে দেখা যায়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছোট্ট রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতেই স্বজনরা গ্রামের পথে যাত্রা করেন। শোকাহত পরিবারের সেই যাত্রা ছিল প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত।

রামিসার স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, বুধবার এশার নামাজের পর মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে মোল্লাবাড়ির বায়তুল আমান জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দাদা-দাদির কবরের পাশে রামিসাকে দাফন করা হয়। ছোট্ট রামিসার দাফনের সময় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

এদিকে রামিসার বাসার সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা সিনথিয়া। তিনি বলেন, “যে অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে, তাকে কেন সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে না? সরকার যদি এই অপরাধের বিচার করতে না পারে, তাহলে জনগণের হাতে তুলে দিক। ধর্ষক ও হত্যাকারীদের বিচার জনগণ করবে। আর কত শিশু এভাবে প্রাণ হারালে সঠিক বিচার নিশ্চিত হবে?”

তিনি আরও বলেন, “আমরাও সন্তান নিয়ে বসবাস করি। এখন নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে আছি। একটি শিশুকে এত নির্মমভাবে হত্যা কোনো মানুষ করতে পারে না। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে দেশে এমন অপরাধ আরও বাড়বে।”

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জানান, সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক রামিসার মা-বাবা শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে মেয়ের কুলখানি ও মিলাদে অংশ নিতে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। বিদায়ের মুহূর্তে বাসার সামনে জড়ো হওয়া মানুষের কান্না, সমবেদনা ও সান্ত্বনার কথায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের দাবি, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো অপরাধে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অনেকেই এ ধরনের অপরাধীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানান। একই সঙ্গে রামিসা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা।

গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসা আক্তার পাশের চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। এ সময় ছোট বোন রামিসা তার সঙ্গে যেতে চাইলে তাকে বাসায় রেখে লুকিয়ে বের হয়ে যান রাইসা। তবে বিষয়টি বুঝতে পেরে রামিসাও দরজা খুলে বড় বোনের পিছু নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় সামনের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) রামিসাকে জোর করে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। এরপর তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

রামিসার পরিবারের সদস্যরা জানান, নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া রাইসা ছোট বোনকে এড়িয়ে চাচার বাসায় যাচ্ছিলেন। পরে রামিসা পেছনে আসায় তাকে আবার রুমে রেখে বের হয়ে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর রামিসাও বাসা থেকে বের হয়ে বড় বোনের পিছু নেয়।

চাচার বাসা থেকে ফিরে এসে রাইসা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা বুঝতে পারেন, রামিসা সেখানে যায়নি। এরপর শুরু হয় তাকে খোঁজাখুঁজি। ভবনের একের পর এক ফ্ল্যাটে খোঁজ নেওয়া হলেও অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলেননি বলে পরিবারের অভিযোগ।

এর আগে ভুক্তভোগী শিশু রামিসার বড় বোন রাইসা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাস্তার ওপারেই আমার চাচার বাসা। আমি সেখানে যাচ্ছিলাম। রামিসাও আমার সঙ্গে যেতে চাইছিল। আমি ওকে ঘরে যেতে বলি এবং রুমে রেখে বের হয়ে যাই। পরে আমার পেছনে বের হলেও আমি খেয়াল করিনি। তখনই দরজার বাইরে থেকে লোকটা রামিসাকে টেনে নিয়ে যায়। ও চিৎকার করেছিল, আম্মু সেই শব্দও শুনেছেন।’

রামিসার মা পারভিন আক্তার বলেন, প্রথমদিকে আমি বুঝতেই পারিনি চিৎকারটি আমার মেয়ের ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ও বড় মেয়ের সঙ্গে গেছে। পরে দেখি বড় মেয়ে একা ফিরে এসেছে। তখনই বুঝতে পারি কিছু একটা হয়েছে এবং মেয়েকে খুঁজতে শুরু করি। একের পর এক ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। সবাই দরজা খুলেছে, শুধু ওই ফ্ল্যাটের দরজা খোলেনি।’

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েকে না পেয়ে ভবনের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তারা। তবে অভিযুক্তের ফ্ল্যাট থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।

রামিসার মা বলেন, অভিযুক্ত সোহেল রানাদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনো ধরনের সম্পর্ক বা পূর্বপরিচয় ছিল না। তারা কয়েক মাস আগে ভাড়া এলেও কোনোদিন তাদের সঙ্গে কথা হয়নি।’

ঘটনার পেছনে কোনো বিরোধ বা অন্য কারণ ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর পেছনে কোনো কারণ নেই, শুধু লালসা। আমার মেয়ে মাত্র দরজা খুলে বের হয়েছিল। এক পায়ে জুতা পরেছিল, অন্য পায়ের জুতা পরারও সুযোগ পায়নি। টেনে নিয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, মেয়ের একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেই আমাদের সন্দেহ হয়। তখনই আমরা ওই ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিই। পরে আশপাশের মানুষ এসে দরজা ভাঙে। পেছনের বাড়ির লোকজন জানিয়েছে, তারা অভিযুক্তকে ওই দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।’

জানা যায়, যে ভবনে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ভবনের মালিক বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে ভবনটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন কেয়ারটেকার। এছাড়া রামিসা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে মিস্ত্রির কাজ করতেন বলে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায় তাকে। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিচার আপনারা করতে পারবেন না। এ ধরনের ঘটনার বিচার হওয়ার কোনো নজির আমি দেখিনি। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। বিচার হবে—এমন প্রমাণ কি দিতে পারবেন? পারবেন না। কয়েকদিন আলোচনা হবে, তারপর আবার অন্য ঘটনা সামনে আসবে, বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স ৫৫ বছর। এতদিনে অনেক ঘটনা দেখেছি। তাই বিচার পাওয়া নিয়ে আমার বিশ্বাস নেই।’

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বুধবার রাজধানীর পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন নিহত শিশু রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।

পুলিশ জানিয়েছে, মামলার ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কিউএনবি/বিপুল/২২.০৫.২০২৬/সন্ধ্যা ৭.৫৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit