সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন

নতুন ভূ- রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশঃ নীতিনির্ধারণ হোক সে মোতাবেক

রাবেয়া বসরী রুমানা। শিক্ষক, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, নির্ঝর।
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৪
  • ১৪৭৬ Time View

নতুন ভূ- রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশঃ নীতিনির্ধারণ হোক সে মোতাবেক

গত আগস্ট রেজিমের পতনের পর বাংলাদেশ একটা প্যারাডাইম শিফটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের জন্য একটা পরিবর্তিত ভূ- রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতার নিরিখে দরকার পড়েছে পূর্বের পলিসিগুলোকে রিভাইস করে নতুন করে ভাববার। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা সুসংহত করতে ভূ- রাজনৈতিক পলিসিতেও প্যারাডাইম শিফট দরকার বলেই মনে করছি। বাংলাদেশের ভূ – রাজনীতিতে মূখ্য ধর্তব্য বিষয়গুলো হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মনোভাব এবং বাংলাদেশের সক্ষমতা।

সেই আলোকেই বাংলাদেশের ভূ- রাজনৈতিক রূপরেখার সারসংক্ষেপ:

১. প্রথমেই বাংলাদেশের উচিত চায়না এবং পাকিস্তানের সাথে একটি সামরিক নিরাপত্তা চুক্তি করা। এবং এর শুরু হতে পারে চায়নাকে তিস্তা প্রজেক্ট দেয়ার মাধ্যমে। যদি চীনকে প্রজেক্টটা দেয়া যায়, এটা হবে বাংলাদেশের ভূ- রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।

২. বাংলাদেশের উচিত রাষ্ট্রটির জাতীয় পরিচয়কে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করা। বর্তমান সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে উল্লেখ থাকলেও, বাংলাদেশকে এর জন্মের পর থেকে বৈশ্বিক চাপে ধর্মনিরপেক্ষ দেখানোর জোর প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছে। কিন্তু সেই চাপের সুযোগে সংখ্যালঘু এবং জঙ্গি ইস্যুতে বাংলাদেশকে বারবার সংকটজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের প্রথমেই যে কাজটা করতে হবে তা হলো বাংলাদেশের সমস্যার ধরণটা সঠিকভাবে নিরূপণ করা। বাংলাদেশের সমস্যাটা মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠের ইস্যু না, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের সংকট বা মেজরিটিরিয়ান ক্রাইসিস। এর একটি উদাহরণ দিচ্ছি বিষয়টিকে বুঝাতে – কিছু দুস্কৃতিকারীদের পরিকল্পিত দুস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে মাদ্রাসার ছাত্রদের মন্দির, হিন্দু বাড়ি পাহারা দিতে হচ্ছে। বিশেষকরে পূজার সময়টাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। এবং সম্প্রতি মন্দিরে মুসলমান ছাত্রদের সংগীত পরিবেশনকে কেন্দ্র করে একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এইযে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে স‍ংখ্যালঘুদের কোন ইস্যু নিয়ে একটা বাড়তি চাপে তটস্থ থাকতে হয় এবং প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন মিডিয়াতে ঐ ইস্যুকে হাইলাইট করে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনাকে চেপে যেয়ে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে তৎপরতা- এটা মেজরিটিরিয়ান ক্রাইসিসের একটা নমুনা। অন্যদিকে আবার আমরা যদি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রী দেশগুলোর দিকে তাকাই, সংখ্যালঘু নিয়ে ইস্যু তেমন শুনতে পাওয়া যায় না। বরং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দাবি করা দেশগুলোতেই আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনিরাপত্তাজনিত খবর শুনতে পাই। এবং গত ফ্যাসিবাদী সরকার সাসটেইন করার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ ছিলো ঐ রেজিমকে ইসলামফোবিয়া দ্বারা লেজিটিমাইজ করা হতো। এমন একটা ধারণা বৈশ্বিক মহলে দেয়ার চেষ্টা করা হতো যে- আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কায়েম হবে। বিদ্যমান সমস্যাকে বিদ্যমান সেট‌আপ দিয়ে দূর করা যায়নি এবং যাচ্ছে না; তাই বাংলাদেশকে প্রকৃত স্বাধীন এবং স্বাবলম্বী হতে হলে সমস্যার মূল ‘কাটিং টু দ্য হার্ট’ এপ্রোচে উপড়ে ফেলতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ সাজার মিথ্যা চেষ্টা থেকে বের হয়ে এসে ৯২‌% মুসলমানের মূল্যবোধের আলোকে এবং অস্তিত্বের বাস্তবতায় দেশকে ইসলামিক রিপাবলিক করা প্রয়োজন মনে করছি। এতে করেই উপরিউক্ত আরোপিত বৈশ্বিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করি।

৩. সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে এসব দেশের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশকে শক্তিশালী করবে।এর জন্য দুই নম্বর প্রস্তাবনার দরকার হবে। এছাড়াও গলফ দেশগুলোর অর্থনীতিও উদীয়মান।

৪. দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য সার্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের অনুপস্থিতি সার্ককে কার্যকর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের উচিত অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর সাথে মিলে সার্ককে পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া। একে কার্যকর করতে উপরে উল্লেখিত প্রস্তাবনাগুলোর দরকার হবে। নয়তো ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ নিশ্চিত করা যাবে না।

৫. ওআইসির কার্যকারিতা জরুরি যদিও এটি অত্যন্ত একটি কঠিন কাজ। নয়তো বাংলাদেশসহ কাশ্মীর, ফিলিস্তিন এবং ভারতের মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এবং চতুর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত ওআইসির একটি অন্যতম কার্যকর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করা। একথা স্বীকার্য যে, বাংলাদেশের এই মুহূর্তে এই পয়েন্টে ডিরেক্ট অবদান রাখার সুযোগ সীমিত থাকলেও, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় পরিবর্তন এবং ঐক্যের আহ্বান অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।

৬. মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক রেখে, রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করা। মানে রাশিয়া প্রথমে প্রায়োরিটি পাবে। এইটা কতটুকু কি করা যাবে এবং এর স্বরূপ কিরকম হবে তা আমি অনুমান করতে পারছি না, এদিকে আমেরিকা আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। পিন পয়েন্ট হচ্ছে: জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে আমেরিকা জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যালাই। আর এদিকে রাশিয়া বাংলাদেশের ব্যাপারে ঠিক কতটুকু আগ্রহী হবে বলতে পারছি না। সাথে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে উদ্বেগ তো কিছুটা শোনা যায়ই।

বিবেচনায় রাখার মতো আরেকটি বিষয় হতে পারে- উন্নত বিশ্ব এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বয়স্ক ডেমোগ্রাফিক সমস্যায় ভুগছে। আমি এই প্রস্তাবনায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় প্রয়োজনের গতিপথটা বলতে চেয়েছি। এবং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য এবং ডেসটিনেশনে ডাইভারসিফিকেশন এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।

৭. বাংলাদেশের সামরিক রিজিলিয়েন্স আফগানিস্তানের মতো বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল ভোগ করবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। কথাটা রূপকার্থে বললেও বুঝাতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রের এই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ জনবলকে শক্তিতে এবং রাষ্ট্রকে সমরাস্ত্রে সুদৃঢ় করা।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা ইস্পাত কঠিন সুদৃঢ় হোক নব্য স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রত্যাশায়।

 

লেখিকাঃ রাবেয়া বসরী রুমানা। শিক্ষক, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, নির্ঝর। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার নিবন্ধ নিউজ মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে থাকে।

 

 

 

 

 

কিউএনবি/অনিমা/১৫ অক্টোবর ২০২৪,/সকাল ১১.৩০

 

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit