মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
আইজিপি’র ‘ক্রসফায়ার’ সম্পর্কিত বক্তব্যের অপব্যাখ্যা অপরাধীদের উৎসাহিত করবে ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি টিআইবির পেছাল ইনডোর গেমস, আবার অনিশ্চিয়তায় এসএ গেমস স্বর্ণের দাম আরও বাড়ল ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে যে কারণে কেইনকে এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা: আরিফুল হক এক দিনে ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, নতুন ভর্তি ২২১৮ বঙ্গোপসাগরে শাক্তিশালী রুপ নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব সাজেক আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বের সংকট, বৈধতা যাচাইয়ে কমিটি সাজেক অবরোধ প্রত্যাহারে সমঝোতা হয়নি দাবি করে অব্যাহত রাখার ঘোষণা

বর্তমান প্রশাসনের বাস্তবতা ও এক ডজন জরুরী প্রস্তাবনা

লুৎফর রহমান, রাজনীতিবিদ ও লেখক।
  • Update Time : সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৪
  • ১০৩৬ Time View

বর্তমান প্রশাসনের বাস্তবতা ও এক ডজন জরুরী প্রস্তাবনা

গত ৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়ে দেশ ছাড়া হয়েছেন। তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। এরপরে ধ্বংসস্তূপের উপর সার্বজনীন মতামতের উপর ক্ষমতা গ্রহণ করে নোবেল লরিয়েট ড.ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী বা তত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকার প্রথমতঃ মারাত্বক সমস্যার মুখোমুখি হয় সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন নিয়ে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনে সরকারি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস্তুপে পরিণত হলেও তা আস্তে আস্তে ঠিক করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বিগত পনেরও বছরের অধিক প্রশাসনে যে ধ্বংসস্তূপ তৈরী হয়েছে তা অপসারণে যে বিলম্বের সৃষ্টি হচ্ছে তার কারণে প্রশাসনে মারাত্বক নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পিছনে আছে বিরাট এক ষড়যন্ত্রের নীল নকশা।

সকলই জানেন, প্রশাসনে এখনো অধিষ্ঠিত আছে সচিব থেকে পদস্থ কর্মকর্তাগণ যারা বিগত পতিত সরকারের আস্থাভাজন, প্রিয়ভাজন, মদদপুষ্ট এবং সুবিধাভোগী। তাদের মাধ্যমে বর্তমান সরকার যত সংস্কার কর্মসূচিই গ্রহণ করুক না তা বাস্তবায়ন বড় সুকঠিন। বিগত পতিত সরকারের ছায়ার মধ্যেই বসবাস করছেন এই সকল কর্মকর্তাগণ।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার অস্থিরতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ পনেরও বছরে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তা কর্মচারীগণ এতদিন অতিবাহিত করতে পারলেও এখন যেন তারা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অস্থির হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে, সচিবালয় ঘেরাও করছে। মাস্টাররোলে কর্মরত কর্মচারীগণ এতদিন কাজ করতে পারলেও এখন যেন পারছেনা। তারা সরকারের কাছে নিয়মিতকরণের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক, নার্স এমনকি আনসার বাহিনী পর্যন্ত সচিবালয় ঘেরাও করে ফেলছে। সকলের দাবি যেন এখুনি মেনে হতে হবে সরকারকে।

আসলে এর পিছনে ঐ ষড়যন্ত্রের আভাসই উল্লেখ করতে হয়। বিগত সরকারের আস্থাভাজন ও মদদপুষ্ট সুবিধাভোগীরা সরকারকে অস্থির করে তুলতে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণে বর্তমান সরকারকেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিগত সরকারের প্রেতাত্মা গুলোকে অপসারণ করতে হবে। এছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই।

সরকার কাঠামোতে সরকারের নীতি বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। সহজভাবে বলা হয় সরকার পরিবর্তনশীল কিন্তু আমলাতন্ত্র স্থায়ী। যেকোন সরকারের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিগত ১৫ বৎসরে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে পূর্ণ ও বিকৃতভাবে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। এক কথায় আমলাতন্ত্র মূল অবয়ব হারিয়ে একদিকে দলীয় অন্যদিকে বিকৃত অবয়বে প্রকাশ লাভ করেছে। এ সময়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়নের ক্ষেত্রে তথাকথিত নিরঙ্কুশ দলীয় ও ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ায় আমলাতন্ত্রের মেরুদন্ড ভেংগে পড়েছে।

প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি

প্রশাসনকে শতভাগ দলীয়করণ করা হয়েছে। প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। কয়েকভাবে এর প্রভাব পড়েছে- একদিকে অধিদপ্তর, পরিদপ্তর সমূহ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ মানছে না আবার জুনিয়র কর্মকর্তারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানেন না।
প্রশাসনে সমন্বয় নেই। এর মাশুল দিতে হচ্ছে জনগনকে।

সরকারী কর্মকর্তারা জনবান্ধব হতে পারেনি। মন্ত্রণালয়সমূহ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, তারা তাকিয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রির কার্যালয় থেকে কি নির্দেশনা আসে। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সার্ভিস রুলস উপেক্ষিত হচ্ছে।

২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিনা ভোটের নির্বাচন, নৈশ ভোটের নির্বাচন ও জালিয়াতি’র নির্বাচনে সরকারী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সংবিধান বহির্ভূতভাবে কর্মসম্পাদন করে সংবিধান লংঘন করেছে। এক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনী, সিভিল প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন কর্মকর্তাগণের ভুমিকা ছিল ঘৃণ্য ও দেশদ্রোহিতার শামিল। এ ধরণের কার্যক্রম সরাসরি সরকারী কর্মচারী’র শৃংখলা পরিপন্থি, রাষ্ট্র ও সংবিধান বিরোধী।স্থানীয় সরকার নির্বাচনসমূহেও সরকারী কর্মচারীদের কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত গর্হিত ও জনবিরুদ্ধ।

বর্তমান সরকার অনেক নিবর্তনমূলক, নির্যাতনমূলক আইন তৈরী করেছে, উল্লিখিত পদধারীরা এসকল নিবর্তনমূলক আইন তৈরির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।মানুষকে নির্যাতনের জন্য, মানবাধিকার, মুক্ত চিন্তা হরণের জন্য সরকার বিভিন্নভাবে সংবিধান লংঘন করেছে, এরা সকলেই সংবিধান লংঘনের কাজে সহায়তা করেছে।

সরকারের বিনা ভোটের নির্বাচন, সংবিধান বহির্ভুত কার্যকলাপের সাথে জড়িত থাকার কারণে সরকারী কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশের মধ্যে ব্যাপকভাবে দূর্ণীতির প্রসার ঘটেছে। সরকারী দল, প্রশাসন একাকার হয়ে সকল কিছুতে পারস্পরিক ইন্ধনে/মদদে যেভাবে খুশি সেভাবে নজিরবিহীনভাবে ক্রয় প্রক্রিয়ায় দৃষ্টিকটুভাবে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার লেশমাত্র কোথাও রাখা হয়নি।
অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এমন অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যেগুলোতে শুধুই অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে আর কোন কাজ শুরু করা হয়নি, অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে যেগুলোর পরিকল্পনা বিষয়ক ব্যপক ত্রুটি রয়েছে, এর মধ্যে অনেক প্রকল্পের বিষয়ে বর্তমান সরকারই বলছে ভুল হয়েছে আবার বলছে অনেক প্রকল্প ভেঙ্গে ফেলতে হবে। অনেক প্রকল্পে আবার বৈশি^ক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষায় দলীয় চিন্তাভাবনা থেকে নিয়োগ দেয়ার ফলে মৌখিক পরীক্ষায় দলীয় চিন্তাধারার বিষয়টি সামনে রেখে নম্বর প্রদান করা হয়। আবার গোয়েন্দা রিপোর্টে দলীয় আনুগত্য আছে কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি দলীয় এমপি বা দলীয় সভাপতির সুপারিশ লাগে। পদায়ন ও পদোন্নতির প্রথম শর্ত সরাসরি আওয়ামী ভাবধারার হতে হবে। দ্বিতীয়তঃ যারা পারিবারিকভাবে আওয়ামী ভাবধারার নয় তারা আওয়ামী ভাবধারায় পরিবর্তিত হয়েছে মর্মে এমপি/মন্ত্রির উপানুষ্ঠিক পত্র/সুপারিশ আনয়ন; অনেকে আবার বছরব্যাপি শেখ মুজিবের ছবি বুকে লাগিয়ে চলাফেরা করা, কথায় কথায় মুজিব বন্দনা, শেখ মুজিবের মাজার জিয়ারতের ছবি তুলে তা ব্যাপকভাবে প্রচার এবং এর সাথে অর্থের লেন-দেন করা। এভাবেই বিগত সরকারের সিভিল প্রশাসন গড়ে উঠেছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যাক্তিসত্ত্বায় যা লক্ষ্যণীয়

কর্মকর্তারা ভীত-সন্ত্রস্ত, নতজানু, ক্ষয়প্রাপ্ত, দূর্নীতিপরায়ন, কেউ কেউ আবার নিষ্ক্রিয়, দূর্ণীতিপরায়ন ও মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়েছে। চিন্তা-চেতনায় দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা পেয়ে বসেছে। মানসিকভাবে স্বপ্নহীন জড়পদার্থের আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।এরা সকলে দুষ্ট চক্রের সাথে এমনভাবে জড়িয়েছে ফলে সবসময় তাদেরকে ভয় তাড়া করছে। এ অবস্থায় বর্তমান প্রশাসন বহাল রাখলে
প্রশাসনের সকল তথ্য পাচার হয়ে যাবে।

যেহেতু এরা সকলেই দুষ্ট চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট, ফলে তারা সবসময়েই ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে। দূর্নীতি যেহেতু এদের মজ্জ¦াগত স্বভাবে পরিণত হয়েছে সেজন্য দূর্নীতির চক্র থেকে এরা বের হতে পারবে না। আওয়ামী দুষ্টচক্র ও সিন্ডিকেটের সাথে এদের যোগাযোগ থেকেই যাবে।

এ অবস্থার নিরসনকল্পে

আপাততঃ ভাবে যে সকল কর্মকর্তাকে ভিন্ন মতের কারণে পদোন্নতি/পদায়ন থেকে বিরত রাখা হয়েছে এদের মধ্যে যারা বাধ্য হয়ে সরকারী চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছে, যারা স্বাভাবিক অবসর গ্রহণ করেছে, যাদেরকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে- তাদের মধ্য থেকে সৎ,দক্ষ ও শুদ্ধ চিন্তার কর্মকর্তাদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে (অন্ততঃ ৫০ থেকে ৬০ ভাগ) পদায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে (এক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আইনগত কোন বাধা নেই)।

রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে জনমুখী সংস্কার আনয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ সেক্টরসমূহে কি অনুপাতে এবং কি ধাচের দূর্নীতি হয়েছে তা চিহ্নিত করে জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ। এতদসংক্রান্ত বিষয়ে এক ডজন প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করা হলো।

১) প্রশাসনের সকল পর্যায়ে ও স্তরে বহাল থাকা ১৪, ১৮ ও ২৪ এর ডিসি, এসপি ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাকে এবং ২৪ এর ছাত্র-গণ আন্দোলনে হত্যাকারীদের ও হুকুমদাতা, উস্কানিদাতাদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

২) উপদেষ্টামন্ডলী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসে একটা ঐক্যমত বা চার্টার তৈরি করা প্রয়োজন।

৩) সাম্প্রতিক আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও পূনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা। সেই সাথে খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার।

৪) প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর এখনও তৈরি হয়নি। পতিত স্বৈরাচারের সকল নিয়োগ বাতিল করা।

৫) প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পূণর্গঠন করা প্রয়োজন।

৬) সচিবালয়ে, পুলিশে, আদালতে, এবং ক্যান্টনমেন্টে আগের সেটআপ বদলে ফেলা। স্বৈরাচারের দোসরদের/সুবিধাভোগীদের বাড়ি পাঠানো/বিচার করা।

৭) জরুরী ভাবে পুলিশ বাহিনী পূণর্গঠন। সে অবধি সেনারা মাঠে থাকুক।

৮) আগের সরকারের দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে অস্ত্র উদ্ধারে কম্বিং অপারেশন।

৯) ট্রুথ এন্ড একাউন্টিবিলিটি কমিশন করে দুর্নীতির সম্পদ উদ্ধার।

১০) ২৭ থেকে ৪২ বিসিএস রিভিউ করতে কমিশন গঠন।

১১) পিএসসি, নির্বাচন কমিশন, দুদক, ইউজিসি সহ বিধিবদ্ধ কমিশন/কাউন্সিলগুলো পূণর্গঠন।

১২) ব্যাংকিং খাত পূণরুদ্ধারে পদক্ষেপ নেয়া।

 

লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক।

 

 

কিউএনবি/বিপুল/২৬.০৮.২০২৪/ বিকাল ৪.১৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit