বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৪ অপরাহ্ন

স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০২৩
  • ৮৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দুই দশক হতে চলল। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় ওই হামলার ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন। আহত অনেকে পরে মারা যান। অনেক কষ্ট নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন অনেকে। ২১ আগস্ট এলেই ভয়াল স্মৃতি জাপটে ধরে তাদের। আবেগাপ্লুত হন স্বজনহারানো পরিবারের সদস্যরা। আজ সেই দিন। আজ ওই ঘটনার ১৯তম বার্ষিকী।

ভয়ংকর ও ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছিল ২১ আগস্ট, ২০০৪ সালে। বিএনপি-জামায়াত জোট তখন ক্ষমতাসীন ছিল। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চে দলটির সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা চলছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

সভার একপর্যায়ে প্রধান অতিথি মঞ্চে উঠলেন, বক্তৃতাও করলেন। বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে (মামলার নথি অনুযায়ী) ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয় সেখানে। সভামঞ্চের আশপাশে উপর্যুপরি আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।

২৪ জন নেতাকর্মীর জীবন ও শত শত নেতাকর্মীর আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেদিন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। রক্তস্নাত হয়েছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক, ঢাকার কালো রাজপথ। আজ সেই বীভৎস ও নারকীয় ঘটনার দিন। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছিল বর্বরোচিত, ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলা। গুলিও চালানো হয়েছিল সেদিন। মঞ্চে থাকা নেতারা মানবঢাল হয়ে রক্ষা করেছিলেন শেখ হাসিনাকে। ডজনখানেক গুলি ছোড়া হয়েছিল। গুলিতে নিহত হন আওয়ামী লীগ সভাপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ।

সেদিনের সেই মানবঢাল রাজনীতির ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। থাকবে তা অনন্তকাল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গৌরবান্বিত এক মানবঢাল, যা রক্ষা করেছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জীবন। সেদিন মঞ্চে থাকা নেতাদের উদ্যোগকে বিস্ময়কর অভিহিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার।

দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বিস্ময়কর বলছি এ কারণে যে, তারা নিজের জীবনের কথা না ভেবে নেতাকে বাঁচাতে হবে- এ কথা আগে ভেবেছিলেন। এমন সিদ্ধান্ত সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা, স্মরণীয় ঘটনা। তারা নিশ্চয়ই জানতেন না যে, নেতাকে বাঁচালে অনেক কিছু পাবেন। এ কারণে ঝুঁকি নেননি তারা। তারা দেখতে পাচ্ছিলেন, তাদের সামনে বিকল্প কিছুই নেই তাদের নেতা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য।’

শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগের বন্ধন ছিল। রাজনৈতিক দলে এটা থাকা উচিতও। আওয়ামী লীগে নেতাকর্মীর এ বন্ধন নিঃস্বার্থ বন্ধনের দৃষ্টান্ত; পদ-পদবির ঊর্ধ্বে এ বন্ধন। সেদিনের ঘটনা তারই প্রমাণ।’

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তি মিছিলের আয়োজন করে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। শান্তি মিছিলের উদ্বোধক ছিলেন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা। কর্মসূচি কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার প্রাণনাশের নীলনকশা আঁকে ষড়যন্ত্রীরা। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য আর্জেস গ্রেনেড দিয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। শান্তি সমাবেশের শেষদিকে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান শেষ হওয়ার আগেই ছোড়া হয় সে গ্রেনেড। গ্রেনেড হামলায় আক্রান্ত হন শেখ হাসিনা। শান্তি মিছিল শেষে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সভামঞ্চে দলের সব কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারাও আক্রান্ত হন। নেতারা নিজেদের জীবনের চিন্তা না করে শেখ হাসিনার জীবনরক্ষায় রচনা করেন মানবঢাল।

সেদিন মঞ্চে উপস্থিত সব নেতা গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিজের শরীরে ধারণ করে অক্ষত রাখেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। বাঁচিয়ে রাখেন তাদের আশা-ভরসার প্রতীক শেখ হাসিনাকে। যদিও হামলার শিকার আওয়ামী লীগ সভাপতির শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। সেদিন জীবন নিয়েছেন দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী। কেন্দ্রীয় একাধিক নেতাসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন, পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

শেখ হাসিনার শরীরের ওপর নিজের শরীর বিছিয়ে দিয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ অসংখ্য স্প্লিন্টার নিজের শরীরে বিঁধিয়েছেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হয়ে রাজনীতির মাঠ আর ফিরে আসা হয়নি তার।

মানবঢাল রচনা করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীসহ অন্য নেতারা স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার করছেন। মানবঢাল একটি গৌরবের নাম। মানবঢাল এখন সম্মানের, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা-বিশ্বাসের প্রতীক। পৃথিবীতে নেতাকে রক্ষার জন্য মানবঢাল রচনার দ্বিতীয় নজির কেউ স্মরণ করতে পারে না।

এ ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার দলে কতটা জনপ্রিয়, কতটা আস্থার আর বিশ্বাসের। দলের শীর্ষসারির নেতাদের প্রাণপণ চেষ্টায় নির্মিত মানবঢালে রক্ষা পেয়েছে শেখ হাসিনার জীবন। কীভাবে নিজের জীবনের কথা না ভেবে, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততির পরোয়া না করে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নেত্রীর জীবনরক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠেন নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রক্ষায় মানবঢাল করে মঞ্চেই থাকেন কিছুক্ষণ। পরে পরিস্থিতি বুঝে তাকে ট্রাক থেকে নামিয়ে তার বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। ওই গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি ছুড়েছিল হামলাকারীরা।

মানবঢাল রচনাকারী নেতা আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে গ্রেনেড হামলা থেকে নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) রক্ষা করেন। আমরা যখন নেত্রীর জীবনরক্ষায় মরিয়া তখন অন্যরকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন তিনি। বললেন, আমি সুধা সদন যাব না, সবাইকে দেখে তারপর যাব। ধানমণ্ডির সুধা সদনে পৌঁছানো পর্যন্ত পথে বারবার তিনি বলছিলেন, “গাড়ি থামাও, আমি যাব না, সবাইকে দেখে তারপর যাব”।’ রাস্তায় আবারও হামলা হয় কি না, সে আশঙ্কাও তাড়া করছিল বলে জানান মায়া।

আওয়ামী লীগের ডেটাবেজ টিমের এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য নুরুল আলম পাঠান মিলন বলেন, ‘রাজনীতিতে, কী তত্ত্বে কী প্রয়োগে, ব্যক্তি ম্যাটার করে। রাজনীতিতে নেতার প্রতি, নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য কর্মীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ দীক্ষাই একজন কর্মীকে উদ্বুদ্ধ করে নেতাকে নিরাপদ রাখতে এবং নেতার বিপন্ন জীবনকে সুরক্ষা দিতে। ২১ আগস্ট মানবঢাল তৈরি করে আমাদের বাতিঘর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জীবনরক্ষার মাধ্যমে আমরা গৌরবের অধিকারী হয়েছি। এমন গৌরবের ভাগীদার হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।’

মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শেখ হাসিনার তখনকার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বর্তমান সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মেজর সোয়েব, মামুন ও জাহাঙ্গীর শেখ হাসিনাকে সেদিন সুধা সদনে রেখে আসেন। ২১ আগস্ট মানবঢাল রচনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য এক ঘটনা। সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসেও।

কিউএনবি/অনিমা/২১ অগাস্ট ২০২৩,/বিকাল ৫:৫৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

January 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit