সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন

হুসনা শেলী’র জীবনালেখ্যঃ স্মৃতিকথা

হুসনা শেলী, ঢাকা।
  • Update Time : শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ১২০ Time View

 স্মৃতিকথা
————
আমার ননাস ছিলেন দুজন আর ভাসুর ছিলেন দুজন। আমি সবার ছোট বউ। ভুঁইয়া বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্ম ছিলেন আমার ভাসুর,ননাসরা। মোট ৫ ভাইবোন কিন্তু কেউই বেঁচে নেই।

আমার ননাসরা সেসময়কালেই প্রচন্ড সামাজিক,সাংস্কৃতিমনা,বুদ্ধিমতি,মেধাবী আর ফরোয়ার্ড ছিলেন কারণ আমার শ্বশুর মশাই মরহুম রাজ্জাক ভুঁইয়া নিজেই তা ছিলেন। ভোলা তখনও মহুকুমা (সাব ডিভিশন)। ভোলাকে জেলা ঘোষণা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ।
.
আমার ছোট ননাস অত্যন্ত গুণী মানুষ ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যটা ছিলো আমারই মতন। তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে দুই মেয়ে নিয়ে বিধবা হন। শরিয়তপুর জেলার ঘড়িষা(সিরাজ শিকদারের বাড়ি) শিকদার বাড়ির জামসেদ শিকদারের স্ত্রী ছিলেন এবং তিনিও ছোট বউই ছিলেন। দুই মেয়ে মিকি(ইসরাত জাহান) আর মিমি(নুসরাত জাহান)নিয়ে ছোট ননাস মণি’বু চলে আসেন পিত্রালয়ে। চরম সংগ্রামী এক নারী জীবন যাত্রা করেন মণি’বু।
.
আমার মেয়ে জন্ম বছর মিমির বয়স ১০ বছর। মিকি ১২ বছর। তো! আমার বন্ধু ছিলো এই দুই ভাগ্নি। পিতার অভাব আমি আমার ভাগ্নীদের কোনওদিনই বুঝতে দেইনি। লেখাপড়া, সেলাইফোঁরাই, সামাজিকতা সব দিক দিয়ে মনের মতন করে গড়ে তুলেছিলাম। ভাগ্নীদের বলেছিলাম জীবন চলার পথ চড়াই-উতরাইময়। সর্বাবস্থায় তোমরা মাথা উঁচু করে বাঁচবে। যদি গরীব ঘরে যাও,রাজ করবে,যদি ধনী ঘরে যাও-দানশীলা হবে। “বিনয়”তোমাদের পাথেয়।

আজ তারা সফল মানুষ। দুই ভাগ্নীকেই মাস্টার্স করিয়েছি বরিশাল বিএম কলেজ ইউনিভার্সিটি থেকে। মিকি কাতার প্রবাসী আর মিমি পুরান ঢাকার যুবলীগ নেতার স্ত্রী। মিমি খুবই সেনসিটিভ আমুদে রিজিট স্বভাবের মেয়ে ছিলো সেই শৈশবেই। হিসেবিও ছিল। ৮৫-৮৬ সালের দিকের ঘটনা।

ভোলায় সিনেমা হল ছিলো তখন দুটো। একটা হলে রাজ্জাক-শাবানা অভিনীত “আগুন” সিনেমাটি রিলিজের সাথে সাথে সুপার ডুপার হিট,মারমার কাটকাট।

“আগুন” ছবির ফ্যাক্ট ছিলো, সুলতানা জামান(এখন বেঁচে নেই) নায়ক রাজ রাজ্জাকের মা। সুখের সংসার ভেংগে যায় রাজ্জাকের পিতা দুর্ঘটনায় মারা গেলে পর! সুলতানা জামানকে পরিবার এক রসকষহীন ব্যবসায়ীর সাথে ২য়বার বিয়ে দেয়। এক ছেলে নিয়ে সুলতানা জামান বৈধব্য জীবন অবসান ঘটিয়ে ২য় স্বামীর ঘরে যাচ্ছেন বধূবেশে,তখন কিশোর রাজ্জাক কেঁদে কেঁদে গাইলেন, “মাগো! তুমি যেওনা,আমায় একা ফেলে–মাগো! ফিরে দেখো!! কাঁদে তোমার ছেলে” (অসাধারণ হৃদয়কাড়া রুণা লায়লা গেয়েছেন)..

আগুনের সব গানই খুবই টাচি ছিলো। মিমি নিজেকে দেখলো পিতার স্নেহ বঞ্চিত তাঁদের জীবনের সাথে সিনেমার কাহিনী মিল..মেয়েটা কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়ে দিলো।

…আমরা দুই ভাগ্নীকে আমাদের কাছে রেখে মণি’বু’কে উনার খালাতো ভাই(আমার খালাতো ভাসুর)ভোলা জেলা ইউনিট মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সাথে ২য়বার বিয়ে দিয়েছিলাম। তখন মিমির মা হারানোর কস্টটা সারাক্ষণ আপসেট করে রাখতো। মিমি আগুন সিনেমাটা ৫ বার দেখেছে আর কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।
.
মণি’বু’র ভাগ্য ২য় বিয়েতেও সুখী করতে পারেনি। খালাতো ভাই হলেও মানুষটা ছিলো প্রচন্ডভাবে বেরসিক,উগ্র মেজাজি,বহির্মুখী, অন্যের জমি-সম্পত্তি জবরদখলকারী,কট্টর আওয়ামী লীগপন্থী পলিটিশিয়ান,ছিলো তাঁর আগের সংসার,সেই সংসারে দুটো সন্তান-কলি-সুমন।

মণি’বু মাত্র ৪২ বছর বয়সে ২০০২ সালে খুবই কস্ট পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। বড়’বু ৫ ভাইবোনের মধ্যে সবার আগে মারা যান ১৯৮৭ সালের ২৭ মার্চ ব্রেইন স্ট্রোকে। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বড় পদে চাকুরী করতেন,তিনি নিঃসন্তান ছিলেন।

আমার ননাসরা ছিলেন অমায়িক মানুষ, উগ্র কেউই ছিলেন না। অহংকার কি জিনিস তা তারা জানতেন না। এত বড় বিখ্যাত ঈসা খাঁ’র ডাইরেক্ট রক্ত ভুঁইয়া বংশের সন্তান ছিলেন তাঁরা কিন্তু কখনো বংশের গরীমা,অর্থবিত্তের দম্ভ ছিলো না ওই ৫ ভাইবোনের।

৯০ দশক অবধি ভোলার ‘ভুঁইয়া পরিবার মানেই রাজ্জাক ভুঁইয়ার পরিবার’- এক ডাকে খেয়াঘাট থেকে গোটা ৮ থানায় তাঁদের নামডাক সুখ্যাতি ছিলো যা আমার পরিবার তাঁদের সবকিছুর তুলনায় নস্যি…!!

দুই ভাগ্নীকে লালনপালন করেছি আমি নিজে। ওদেরকে পিতা-মাতার অভাব কখনও বুঝতেই দিইনি! কোনও খোঁটাও দেইনি,কোনও গঞ্জনা দেইনি। মণি’বু’র যদিও ২য় বিয়ে হয়েছে কিন্তু তিনি তাঁর বাবার বাড়িতেই আমাদের মাঝে থেকেছেন সুদীর্ঘ বছর। পরে অন্যত্র জায়গা কিনে বাড়ি করে সেখানেই জীবন কাটিয়ে গেছেন মৃত্যু পর্যন্ত।

মানুষ বলে যদি কারও ভালো করো,তোমার সন্তানরা তাঁর বিনিময় পাবে। আমার সন্তানরা উস্টা লাথি ছাড়া কিছুই পায়নি এই দুনিয়ায়। তাদের অর্থবিত্ত না থাকলেও মানুষের প্রতি মানুষের দায় কর্তব্য ঠিক ঠিকই পালন করায় অভ্যস্ত, স্বহজাত। ইন শা আল্লাহ.. আখেরাতে তাঁরা সব পাবে। নাম,ডাকই সব নয়।

মণি’বু যে কতটা গ্রেট সোল ছিলেন!! আমার আম্মা,আব্বার প্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি । কিন্তু “অতি বড় ঘরণি না পায় ঘর” শাস্ত্রের কথা..তিনি গরীবদের প্রতি আত্মীয়স্বজনদের প্রতি বিড়ম্বিত ভাগ্য হওয়া সত্তেও দানশীল ছিলেন। অহংকারবশতও কখনো কথায় কথায় বলেন নি “কত মানুষকেইতো দান খয়রাত করলাম! করি!”এই বক্তব্য কিংবা ইনটিউন কিংবা গ্যাশ্চার কিংবা বডি লেংগুয়েজ অকাট্য দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।

আল্লাহ দানশীল,দানের সুযোগ সবাইকে দেন, সেটা একমাত্র আল্লাহপাকের এখতিয়ার। কোনও মানুষের ক্ষমতা নেই কোন কিছু কাওকেই দান করার। যাদেরকে এই তৌফিক দিয়েছেন বা দেন তারা যদি বিনয়ী হয় দান ৭০ হাজার গুণ আল্লাহ বাড়িয়ে দেন। আর যদি “কত দিবো? কত দান করি” দম্ভোক্তি করা হয় আল্লাহপাক উক্ত দাতাদের কিসমত কাটতে শুরু করেন এরপর যদি না শুধরায় তো! সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা সর্বশক্তিমান আল্লাহ দানশীল হিরোদেরকে জিরো বানিয়ে নজির করে দেন।

আমি,আমার বাচ্চারা আমাদের জীবনে অপমান অপদস্ততা ছাড়া কিছুই পাইনি। তবু বলি-সবাই ভালো থাকুক। সেই বয়সে মণি’বু’র জীবন দেখে আমিও বুঝে নিয়েছিলাম যে বাংলাদেশে নারীরা কত অসহায়!!!

কেওই বলতে পারেনা তাঁর/তাঁদের মেয়ে সন্তানদের কপালে আল্লাহ কি লিখে দিয়েছেন,জন্ম থেকে কবর অবধি মেয়েদের কি কি মোড়,রঙ দেখিয়ে থাকে।

 

 

লেখিকাঃ হুসনা শেলী নিয়মিত লেখালেখি করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর লেখা বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে। এই লেখাটি তাঁর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া হয়েছে।

 

 

 

 

 

কিউএনবি/বিপুল/১৭.০৯.২০২০/ দুপুর ১.৩১

সম্পর্কিত সকল খবর পড়ুন..

আর্কাইভস

October 2022
MTWTFSS
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
© All rights reserved © 2022
IT & Technical Supported By:BiswaJit
themesba-lates1749691102