জালাল আহমদ, শেরপুর থেকে : স্থগিত হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের ভোটগ্রহণ আগামীকাল ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে।গারো পাহাড়ের সবুজে ঘেরা শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে বিএনপি- জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে শেয়ানে শেয়ানে লডাইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুজনিত কারণে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।পরে এই আসনের পুনরায় তফসিল ঘোষণা করা হয়।
এবার এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল,দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের মাসুদুর রহমান এবং কাঁচি প্রতীকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জানা গেছে, শেরপুর জেলার শ্রীবর্দি উপজেলা ও ঝিনাইগাতি উপজেলা নিয়ে গঠিত শেরপুর-৩ আসনটি এক সময় জামালপুর-৮ আসন ছিলো। পরে জামালপুর থেকে শেরপুর জেলা পৃথক হলে শেরপুরের শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী
নিয়ে শেরপুর-৩ আসন গঠিত হয়।
বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল এর পিতা ডাক্তার
সেরাজুল হক ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
ও ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।সেরাজুল হক ১৯৯৪ সালের ২৮ অক্টোবর সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৯৫ সালে এই আসনের উপ-নির্বাচনে মাহমুদুল হক রুবেল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি ১৯৯৬
সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে শেরপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তবে তিনি জুন ১২, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।২০০৮ সালের নবম ও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।সেরাজুল হকের ছোট ভাই এবং রুবেলের চাচা এ কে এম ফজলুল হক
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শেরপুর-৩ আসন থেকে ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য
নির্বাচিত হন। তাই এই আসনে “হক পরিবারের” শক্ত একটা ভিত্তি আছে।
রুবেল বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি।বিএনপি সরকার গঠন করার কারণে জয়ী হতে মাহমুদুল হক রুবেল পরিবার সহ ঈদের পর থেকে জোরালো প্রচারণা চালান। দলীয় ভেতরে কিছু মতভেদ থাকলেও ধানের শীষের পক্ষে নেতাকর্মীরা একত্র হয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে হারানো অবস্থান ফিরে পেতে মাঠে নেমেছেন সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য রুবেল।তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়ে চমক দেখিয়েছেন তার স্ত্রী ফরিদা হক দীপা ও মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম।বিশাল নারী ভোটব্যাংক দখলে নিতে বিএনপির প্রার্থীর স্ত্রী ফরিদা হক দিপা এবং মেয়ে আইন বিষয়ের ছাত্রী রুবাইদা হক রিমঝিম দিনরাত প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়ায় পাড়ায় উঠান বৈঠক করছেন।অস্ট্রেলিয়া পড়ুয়া ছেলে তরুণ রাফিদুল হক শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আমিনুল ইসলাম বাদশার মতো প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থী রুবেলের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় বিএনপি এখন অনেকটাই সুসংহত। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী আলহাজ মাসুদুর রহমান মাসুদও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। তিনি প্রয়াত জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই। বড় ভাইয়ের জনপ্রিয়তা ও দলীয় সংগঠনের ওপর ভর করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন তিনি।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে , উন্নয়ন ধারাবাহিক রাখতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী চান তারা তবে কেউ কেউ নতুন নেতৃত্ব দেখতে চান।তারা সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর প্রতি অসন্তোষের কথাও জানিয়েছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীদের সাথে কথা জানা গেছে,সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটগ্রহণ হলে ‘নীরব ব্যালট বিপ্লব’ ঘটবে এবং তাদের প্রার্থী বিজয়ী হবেন।ইদানীং শেরপুর জেলায় জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের ভোট ব্যাপক বেড়েছে। শেরপুর সদর আসনের বর্তমান এমপি জামায়াতের ই ।
বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, “মানুষের সুখে-দুঃখে দীর্ঘদিন ধরে পাশে আছি। করোনার সময় এবং বন্যার সময় মানুষের পাশে ছিলাম।উন্নয়নের স্বার্থে ভোটাররা ধানের শীষের পক্ষেই রায় দেবেন। ”অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী আলহাজ মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, “পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি পেতে ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেবেন। আমার ভাইয়ের জনপ্রিয়তাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। ”
সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, “অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।শেরপুর-৩ আসনের দুই উপজেলার মোট ১৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ১২৮টি ভোট কেন্দ্রে মোট ৪ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রদান করবেন। নির্বাচনের দিন বিচারকি ক্ষমতাসহ ম্যাজিস্ট্রেট ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব এবং পুলিশ সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে থাকবে।”
কিউএনবি/আয়শা/০৮ এপ্রিল ২০২৬,/রাত ১১:২২