মশিউর রহমান, আশুলিয়া (ঢাকা) প্রতিনিধি : শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়া শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চল। এই অঞ্চলে ৬৪টি জেলার মোট ৭৫ লাখ বিভিন্ন পেশার মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে নানা ঘটনা। প্রশাসনকে এই সব ঘটনার সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং ও মাদকের আখড়া যেন এক রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
শঙ্কা আর হতাশার মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছে জনজীবন। এই গ্যাং এর ভয়ে আবার কেউ কেউ ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এমনও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।বিশেষ করে আশুলিয়ায় কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারীদের এখন দৌরাত্ম্যে অস্থির এক জনপদ।প্রকাশ্যে দেশী-বিদেশী অস্ত্রের মহড়া, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, চুরি-ছিনতাই ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
একের পর এক ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান গ্রেফতার বা বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের নজির না থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এ অঞ্চলে এখন কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারীদের সক্রিয় আস্তানায় পরিণত হয়েছে। মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিতই ঘটছে হামলা, ভাঙচুর, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। নিজেদের শক্তির জানান দিতে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া, প্রকাশ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে দিনের আলোতেই।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তবে এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে জামগড়া এলাকা থেকে ১৪ জন কিশোর গ্যাং গ্রেফতার হলেও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সন্ধ্যা নামলেই আশুলিয়ার জামগড়া প্রাইমারী স্কুল এলাকা, জামগড়া সিনিসিন মোড় এলাকা, ভাদাইল, রুপায়ন মাঠ, বিভিন্ন হাউজিং এলাকা, নাভানা মাঠ, ছয়তলা, গাজিরচট আড়িয়ারার মোড়, উষা পল্ট্রি এলাকা, চিত্রশাইল, কান্দাইল, বাগবাড়ি, ইউসুফ মার্কেট, জিরাবো, তৈয়্যবপুর, সরকার মার্কেট, বান্দ ডিজাইন এলাকা, নিশ্চন্তপুর ও নারসিংহপুরসহ নানা স্থানে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা, এসব ঘটনা কিশোর গ্যাংরাই সংঘটিত করছে বলে এমনটাই জানান স্থানীয়রা। এছাড়াও অবাদে মাদক বিক্রিতেও পিছিয়ে নেই এই কিশোর গ্যাংরা।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভাড়াটিয়া, গার্মেন্টস কর্মী ও সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক। দিনের পর দিন এমন অস্ত্রের মহড়া ও হামলার ঘটনা ঘটলেও কিশোর গ্যাং সদস্যদের মূল হোতারা দৃশ্যমান গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। মাদকের প্রভাবেই উঠতি বয়সী কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমন মত স্থানীয়দের। শান্তি ফেরাতে নিয়মিত অভিযান ও টহল জোরদারের পাশাপাশি প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
জামড়ার মোল্লা বাজার এলাকায় মেহেদী নামে এক ভ্যানগাড়ী ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, কিশোর গ্যাং লিডার রাজ কুমার ওরফে রাজু সে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত থেকে এলাকায় নানা অপকর্ম করেছে। এখন বিএনপি আসার পরে সে একই ধরনের কাজ করছে। ব্যবসা করতে হলে তাকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হবে। এতে আমি রাজি না হলে রাজুর নেতৃত্বে সোহাগ ও সুমন সহ তাদের গ্যাংরা আমার দোকানে ভাংচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। থানায় অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কোন ব্যাবস্থা নেয়নি। এখন আমি তাদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

এক চা দোকানী বলেন, এর আগে হঠাৎ গুলির শব্দ, তখন আমি কাস্টমারের জন্য চা রেডি করছিলান। পরে দেখলাম এক একজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র। ভয়ে দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যাই। একপ্রকারে ভয়ে থাকতে হয়। তবে ইদানীং পুলিশ অভিযান করার পরে একটু কমছে। প্রতিদিন অভিযান হলে এলাকাটা শান্ত হয়ে যাবে। তাহলে আমরা নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারবো।
এক নারী ভাড়াটিয়ারা বলেন, দুইদিন পরপর গোলাগুলি হয়। হেদিনকারও গোলাগুলি হইছে, আমি অসুস্থ মানুষ তহন বাসায় ঢুকছিলাম। গুলি যদি আমার গায় লাগতো, আমরা গরীব মানুষ আমরাতো বিচার পাইতাম না।এক পথচারী বলেন, কিশোর গ্যাংরা মাদকের জন্য খুনও পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করে না। তাই এর সমাধান করতে হবে।রিয়াদ নামে এক পোশাক শ্রমিক বলেন, একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ অস্ত্রের মহড়া সহ গুলির শব্দ শুনে ভয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি।
এই গুলি যদি আমার গায়ে এসে লাগতো তাহলে কি অবস্থা হতো।এবিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কিশোর গ্যাং যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গ্যাপ পড়ে যাবে। এজন্যই কিশোরদের ভোকেশনাল ট্রেনিং শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। এতেকরে একদিকে অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে, অন্যদিকে কিশোররা কর্মে নিয়োজিত থেকে বিভিন্ন অপকর্ম থেকে বিরত থাকবে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, আশুলিয়ার জামগড়া এলাকাকে চাঁদাবাজী, মাদক ও কিশোর গ্যাং মুক্ত করে ছাড়বো। ইতোমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে ১৪জন কিশোর গ্যাংকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।জামগড়া এলাকায় মাঝে মধ্যে গুলির ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক (উত্তর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আরাফাতুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছেন। এছাড়াও জামগড়া বাসীর কাছে বিনীত আহবান যদি কেউ কিশোর গ্যাং ও মাদকের সাথে জড়িত থাকে, তাহলে আমাদেরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন। আমরা অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় আনবো।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় কিশোর গ্যাং এর তান্ডব বেড়ে গেছে। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আইনের আওতায় এনে এ অঞ্চলকে কিশোর গ্যাং ও মাদকমুক্ত জরা হবে।অন্যদিকে, জামগড়া এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের তৎপরতার বিষয়টি স্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চলমান রয়েছে বলে জানান ঢাকা জেলা পুলিশ মিজানুর রহমান।
কিউএনবি/অনিমা/২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/দুপুর ২:৪০