আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন, তখন তেহরানের হামলায় একের পর এক মুখ থুবড়ে পড়েছিল মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ৪২টি সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সুপার-কম্পিউটার ড্রোন হারিয়েছে আমেরিকা। এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার থেকে শুরু করে হান্টার-কিলার রিপার ড্রোন—আমেরিকার কোনো প্রযুক্তির জাদু-ই খাটল না ইরানের আকাশে! পেন্টাগনের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-কে ব্যর্থ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ধাক্কা দিল তেহরান। ইরান প্রমাণ করলো— আকাশ এখন আর আমেরিকার একার নয়। চলুন জেনে নিই ইরান যুদ্ধে কোন কোন শক্তিশালী সামরিক বিমান ও ড্রোন হারাল যুক্তরাষ্ট্র।
এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল
এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি অলরাউন্ডার যুদ্ধবিমান। যার মূল কাজ শত্রুঘাঁটিতে ঢুকে নিখুঁতভাবে বোমা হামলা করা, আবার প্রয়োজনে আকাশে শত্রুর যুদ্ধবিমানের সঙ্গে লড়াইয়ে মেতে ওঠা। এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো অবিশ্বাস্য গতি এবং ধারণক্ষমতা। এটি শব্দের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি গতিতে উড়তে পারে এবং একসাথে প্রায় ২৩ হাজার পাউন্ড ওজনের সব প্রচলিত ও পারমাণবিক বোমা বহন করতে পারে। দিন হোক বা রাত, যেকোনো আবহাওয়ায় এটি শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত আঘাত হানতে ওস্তাদ। ইরান যুদ্ধে এমন চারটি যুদ্ধবিমান খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এফ-৩৫এ লাইটনিং ২
এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ কে বলা হয় আকাশের সবচেয়ে চালাক এবং আধুনিক ‘স্টিলথ’ ফাইটার। এর মূল কাজ হলো শত্রুর আকাশসীমা সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং গোপনে নজরদারি করা। এর আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর বডিতে; শত্রু রাডারে একে একটা ছোট পাখির মতো দেখায়, যার ফলে ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব।
এছাড়া এই বিমানে পাইলট হেলমেট পরেই নিচের পুরো যুদ্ধক্ষেত্র ৩৬০ ডিগ্রি কোণে দেখতে পান। এটি শুধু একটা ফাইটার জেট নয়, এটি আকাশের একটি উড়ন্ত সুপার কম্পিউটার। ইরান যুদ্ধে এমন একটি যুদ্ধবিমান খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২
এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ সৈন্যদের কাছে ‘ওয়ারথগ’ নামে পরিচিত। এর মূল কাজ মাটিতে থাকা শত্রুসেনা, ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যান ধ্বংস করে নিজেদের সেনাদের রক্ষা করা। এতে আছে ৩০ মিলিমিটার গ্যাটলিং গান, যা প্রতি মিনিটে প্রায় ৩,৯০০ রাউন্ড বুলেট ছুড়তে পারে। এর পুরো ককপিটটাই টাইটানিয়ামের তৈরি। যার ফলে শত্রুপক্ষের তীব্র গোলাগুলি খেয়েও এটি অনায়াসে আকাশে উড়ে বেড়াতে পারে। ইরান যুদ্ধে এমন একটি যুদ্ধবিমান খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার
সহজ ভাষায় কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার হলো একটি ‘উড়ন্ত পেট্রোল পাম্প’। মাঝআকাশে মার্কিন ফাইটার জেটগুলোর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে, এই বিমানটি তাদের রিফুয়েলিং করে। এটি প্রায় ২ লাখ পাউন্ড জ্বালানি নিয়ে উড়তে পারে। এই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি মার্কিন বিমানবাহিনীকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নন-স্টপ অপারেশন চালানোর শক্তি দেয়। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সাতটি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ই-৩ সেন্ট্রি হলো একটি উড়ন্ত কন্ট্রোল টাওয়ার। বোয়িং ৭০৭ বিমানের ওপর বিশাল একটা ঘুরন্ত রাডার বসিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। এর মূল কাজ পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর নজর রাখা, শত্রুর বিমান বা জাহাজের অবস্থান ট্র্যাক করা এবং নিজের দলের ফাইটার জেটগুলোকে নির্দেশ দেওয়া। এটি সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরের যেকোনো উড়ন্ত বস্তুকে মুহূর্তেই শনাক্ত করতে পারে। ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি উড়ন্ত কন্ট্রোল টাওয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে।
এমসি-১৩০জে কমান্ডো ২
এমসি-১৩০জে কমান্ডো ২ মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের অত্যন্ত গোপন এবং বিপজ্জনক মিশনের সঙ্গী। এর মূল কাজ রাতের অন্ধকারে, রাডার ফাঁকি দিয়ে শত্রুর সীমানায় কমান্ডোদের নামিয়ে দেওয়া বা উদ্ধার করা। এটি অত্যন্ত নিচু দিয়ে এবং যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়তে পারে। শুধু তাই নয়, এটি কোনো উন্নত রানওয়ে ছাড়াই ভাঙাচোরা রাস্তা বা কাঁচা মাটিতেও ল্যান্ড এবং টেক অফ করতে সক্ষম। ইরানের হামলায় এমন দুটি দুর্ধর্ষ বিমান খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন ২
এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন ২ মূলত একটি আধুনিক কমব্যাট রেসকিউ হেলিকপ্টার। এর প্রধান কাজ যুদ্ধক্ষেত্রের একদম মাঝখান থেকে আহত সেনা বা শত্রু এলাকায় ভেঙে পড়া বিমানের পাইলটদের উদ্ধার করা। হেলিকপ্টারটি খুব সহজেই শত্রুর রকেট বা মিসাইলকে জ্যাম করে দিতে পারে। এছাড়া এতে রয়েছে মাঝআকাশে জ্বালানি নেওয়ার সুবিধা, যার ফলে এটি দুর্গম অঞ্চলেও উদ্ধারকাজ চালাতে সক্ষম। ইরানযুদ্ধে এমন একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমকিউ-৯ রিপার
এমকিউ-৯ রিপার হলো পৃথিবীর অন্যতম মারাত্মক ‘হান্টার-কিলার’ ড্রোন। এর মূল কাজ আকাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থেকে শত্রুর ওপর নজরদারি এবং সুযোগ বুঝে মিসাইল ছুড়ে টার্গেট ধ্বংস করা। ড্রোনটি একটানা ২৭ ঘণ্টা আকাশে ভেসে থাকতে পারে। হাজার মাইল দূরে বসে এই ড্রোন দিয়ে শত্রুঘাঁটি উড়িয়ে দেয়া সম্ভব। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এমন ২৪টি শক্তিশালী ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন, এটি মূলত সমুদ্রে নজরদারির জন্য তৈরি বিশাল ড্রোন। এটিকে মার্কিন নৌবাহিনীর চোখ বলা হয়। এর মূল কাজ সাগরের বিশাল এলাকা জুড়ে শত্রুদেশের যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন বা যেকোনো সন্দেহজনক গতিবিধি ট্র্যাক করা। এটি একটানা ৩০ ঘণ্টা প্রায় ৫৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড়তে পারে। এক মিশনেই এটি লাখ লাখ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা স্ক্যান করে রিয়েল-টাইম ডেটা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিতে পারে। ইরান যুদ্ধে এমন একটি শক্তিশালী ড্রোন খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
কিউএনবি/আয়শা/২৯ মে ২০২৬,/রাত ১১:১৫