সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:১৩ অপরাহ্ন

কোরআন-হাদিসের আলোকে শবেকদরের আলামত

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫
  • ১১৫ Time View

ডেস্ক নিউজ : প্রতিবছর একটি রাত আসে, যে রাতকে মহান আল্লাহ অন্য সব রাতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সেই রাতটির নাম ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদরের রাত, যার অপর নাম শবেকদর। আল্লাহ মহিমান্বিত এই রাতে কোরআন নাজিল করেছেন এবং রাতকে হাজার মাসের চেয়ে মর্যাদাবান ঘোষণা করেছেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে। আর মহিমান্বিত রাত সম্পর্কে তুমি কি জানো? মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ১-৩)

পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা শবেকদর বা কদরের রাতের মর্যাদা প্রমাণিত। কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য দ্বারা বোঝা যায় এই রাতটি পবিত্র রমজান মাসের একটি রাত।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কাছে এ মাস সমুপস্থিত। এতে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। শুধু বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৪৪)

অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতের ইবাদত করবে, তার পূববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ৩৫)

প্রশ্ন হলো, সেই রাতটি আমরা চিনব কিভাবে? নবীজি (সা.) রাতটির নির্দিষ্ট তারিখ না বলে গেলেও বিভিন্ন সময় এর কিছু আলামত সম্পর্কে উম্মতকে অবহিত করেছেন। নিম্নে হাদিসের আলোকে সেগুলো তুলে ধরা হলো—

নির্দিষ্ট কিছু তারিখ সম্পর্কে ইঙ্গিত

রমজানের শেষ দশক : পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকে শবেকদর হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি, তাই নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকে গুরুত্বসহকারে ইতিকাফ করতেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে শেষ দশকে কদরের তালাশ করার পরামর্শ দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (বুখারি, হাদিস : ২০২০)

বুখারি শরিফের অন্য আরেকটি বর্ণনায় নবীজি (সা.) শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি বলেছেন, …তোমরা তা শেষ দশকে তালাশ করো এবং প্রত্যেক বিজোড় রাতে তালাশ করো…। (বুখারি, হাদিস : ২০২৭)

কোনো কোনো বর্ণনায় আবার শেষ সাত দিন কদরের তালাশের কথাও এসেছে। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত যে একদল লোককে শবেকদর (রমজানের) শেষ সাত রাতের মধ্যে রয়েছে বলে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আর কিছুসংখ্যক লোককে তা শেষ দশ রাতের মাঝে আছে দেখানো হয়েছে। তখন নবী (সা.) বললেন, ‘তোমরা শবেকদর শেষ সাত রাতের মধ্যেই খোঁজ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯৯১)

আবার কখনো নবীজি (সা.) ২৭, ২৯ ও ২৫তম রাতকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হলেন। তখন দুজন মুসলমান বিবাদ করছিল।

তিনি বললেন, আমি তোমাদের লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বেরিয়েছিলাম; কিন্তু তখন অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত থাকায় তা (লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কিত জ্ঞান) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর হয়তো বা এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তোমরা তা অনুসন্ধান করো (রমজানের) ২৭, ২৯ ও ২৫তম রাতে। (বুখারি, হাদিস : ৪৯)

আবার মুসলিম শরিফের একটি বর্ণনায় ২৭ তারিখের কথাও বলা হয়েছে।

অতএব, রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে গুরুত্বসহকারে ইবাদত করলে শবেকদর পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।

আকাশ ও আবহাওয়া

শবেকদরের রাতে পৃথিবীতে অন্য রকম আবহওয়া সৃষ্টি হয়। তাই সে রাতের আবহাওয়া দেখেও রাতটি অনুমান করা সহজ হয়। উবাদাহ ইবনে সামেত (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, কদরের রাতের অন্যতম লক্ষণ হলো, রাতটি হবে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল, যেন এতে উজ্জ্বল চাঁদ রয়েছে। এটি থাকবে শান্ত ও স্থির, না ঠাণ্ডা, না গরম। সেই রাতে কোনো নক্ষত্র পতিত হবে না যতক্ষণ না সকাল হয়। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৭৬৫, শুআইবুল আরনাউত)

কারো কারো মতে, সে রাতে মৃদু বৃষ্টি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা নবীজি (সা.)কে যখন স্বপ্নযোগে শবেকদর দেখানো হয়েছিল, তিনি দেখতে পান যে সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানের মধ্যম দশকে ইতিকাফ করতেন।

এক বছর এরূপ ইতিকাফ করেন, যখন একুশের রাত এলো, যে রাতের সকালে তিনি তার ইতিকাফ থেকে বের হবেন, তখন তিনি বলেন, যারা আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে তারা যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। আমাকে স্বপ্নে এই রাত (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল, পরে আমাকে তা (সঠিক তারিখ) ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আমি স্বপ্নে দেখতে পেয়েছি যে ওই রাতের সকালে আমি কাদা-পানির মাঝে সিজদা করছি। তোমরা তা শেষ দশকে তালাশ করো এবং প্রত্যেক বিজোড় রাতে তালাশ করো। পরে এই রাতে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, মসজিদের ছাদ ছিল খেজুরের পাতার ছাউনির। ফলে মসজিদে টপটপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। একুশের রাতের সকালে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কপালে কাদা-পানির চিহ্ন আমার এ দুই চোখ দেখতে পায়। (বুখারি, হাদিস : ২০২৭)

চাঁদের অবস্থা

শবেকদরের রাতে যদি চাঁদ ওঠে, তবে সে চাঁদের আকৃতি কেমন হবে, তার ধারণাও হাদিসের মতে রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কদরের রাত সম্পর্কে আলাপ আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে সে (রাত) স্মরণ রাখবে, যখন চাঁদ উদিত হবে থালার একটি টুকরার ন্যায়। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৯)

সেদিন সকালের সূর্যের অবস্থা

হাদিসে এসেছে শবেকদরের পর যে সূর্য উদিত হবে, সে সূর্য অন্য দিনের সূর্য থেকে আলাদা হবে। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সারা বছর রাত জেগে নামাজ আদায় করবে সে কদরের রাত প্রাপ্ত হবে।

এ কথা শুনে উবাই ইবনু কাব বললেন, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই সেই মহান আল্লাহর কসম! নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর রমজান মাসে। এ কথা বলতে তিনি কসম করলেন, কিন্তু ইনশা আল্লাহ বললেন না (অর্থাৎ তিনি নিশ্চিতভাবেই বুঝলেন যে রমজান মাসের মধ্যেই ‘লাইলাতুল কদর’ আছে)।

এরপর তিনি (সা.) আবার বললেন, আল্লাহর কসম! কোন রাতটি কদরের রাত তাও আমি জানি। সেটি হলো এ রাত, যে রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সালাত আদায় করতে আদেশ করেছেন। ২৭ রমজান তারিখের সকালের পূর্বের রাতটিই সে রাত। আর ওই রাতের আলামত বা লক্ষণ হলো, সে রাত শেষে সকালে সূর্য উদিত হবে তা উজ্জ্বল হবে, কিন্তু সে সময় (উদয়ের সময়) তার কোনো তীব্র আলোকরশ্মি থাকবে না (অর্থাৎ দিনের তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ হবে)। (মুসলিম, হাদিস : ১৬৭০)

উপরোক্ত আলামত ও তারিখগুলোতে শবেকদর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তাই আমাদের উচিত, রমজানের প্রতিটি রাত বিশেষ করে শেষ দশকের রাতগুলোকে ইবাদতের মাধ্যমে কাটিয়ে শবেকদর অনুসন্ধানের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মহিমান্বিত এই রাতের ফজিলত অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কিউএনবি/অনিমা/২৩ মার্চ ২০২৫,/বিকাল ৩:০৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

January 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit