শান্তা ইসলাম,নেত্রকোনা প্রতিনিধি : নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরে কৃষকদের ফসল রক্ষার জন্য (কাবিটা) প্রকল্প পিআইসির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে। বাঁধের সংস্কার কাজ চলছে ধীরগতিতে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার আশঙ্কায় আছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।হওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নির্ধারিত সময় ৭৫ দিন। এরমধ্যে ৬১ দিন চলে গেছে, বাকি আছে ১৪ দিন। তবে প্রকল্প পিআইসি’র দাবি কার্যাদেশ সময়মত না পাওয়ায় কাজে বিলম্ব হচ্ছে। গত বুধবার পর্যন্ত জেলার খালিয়াজুরী ও মদনের কয়েকটি বাঁধের কাজ শুরু হলেও কিছু প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখেছে পিআইসি। দু’একটি বাঁধের উপরের অংশ কেটে ও নিয়ম বর্হিভূতভাবে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি নিয়ে নির্মাণ ও সংস্কার করা হচ্ছে। প্রকল্প কাজের এ ধীরগতি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে আগাম বন্যায় ফসলহানির আতঙ্ক বিরাজ করছে।নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে তা শেষ করার কথা। এর আগে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন এবং ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণের কাজ চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু পানি ধীরগতিতে নামায় প্রকল্প নির্ধারণের কাজ চূড়ান্ত করতে দেরী হয়। হাওরে একসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর পাউবো হাওরে বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের পিআইসি কমিটি গঠন করা হয়। একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। নেত্রকোনায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এসব বাঁধের ওপর কৃষকদের প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভর করে। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে জেলায় ১৭৮টি পিআইসি গঠিত হয়েছে। ওই ১৭৮টি পিআইসির ১৫৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।জানা গেছে, জেলার খালিয়াজুরী উপজেলায় ১০৮টি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, মদনের ২৫টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ধরা হয় ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, মোহনগঞ্জে ২৬টি পিআইসি প্রকল্পের জন্য ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা, কলমাকান্দায় ৭টি প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বারহাট্টায় ৯টি প্রকল্পের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, পূর্বধলায় ২টি প্রকল্পের জন্য ৪৫ লাখ টাকা এবং আটপাড়ায় ১টি প্রকল্পের জন্য ১১ লাখ টাকা। নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জের কয়েকটি হাওর সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে ধীর গতিতে। দু’একটি বাঁধের কাজ শেষের দিকে। কিছু প্রকল্পের কাজ প্রায় অর্ধেক হয়েছে। কিছু প্রকল্পে এখনো মাটি পড়েনি। কোন কোন প্রকল্পে দু’এক গাড়ী মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। কোন প্রকল্পের মাটি ভেকু দিয়ে খুরে সমান করে কাজ সম্পন্ন করার পায়তারা চলছে। আবার কোন কোন প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র।স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, হাওরে বাঁধ নির্মাণ পুরোনো বৃত্তেই আটকে আছে। শুরুতে ঢিলেমি আর শেষে তাড়াহুড়া। এবারও মাঠে তাই হচ্ছে। তবে পিআইসি ও পাউবো যে ঢিলেমি করেছে সময় মতো কাজ সম্পন্ন করা তো দূরের কথা- আগাম বন্যা হলে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু প্রকল্প ফসলহানির কারণ হয়ে যেতে পারে। কাজ শুরুতে বিলম্বের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মাটির কাজের জন্য খননযন্ত্রের (এক্সকাভেটর) অপ্রতুলতার সঙ্গে এবার নির্বাচনকে সামনে আনছেন।খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের বাসিন্দা কৃষক রঞ্জন সরকার বলেন, আমি ৮-৯ বছর বাঁধ নির্মাণের কাজ করেছি। এবার কাজ শুরু করতে অনেক দেরী করা হয়েছে। যদি আগাম বন্যা দেখা দেয় তাহলে ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে আমি দেখে এসেছি পাউবো’র উদাসিনতায় বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারের টাকা অপচয় হচ্ছে। অনেক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হলেও যে পরিমাণ বরাদ্ধ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্থ না হলেও সে পরিমাণ বরাদ্ধ দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, খালিয়াজুরী পোল্ডার-২ খালিয়াজুরী সদর থেকে কীর্তনখলা পর্যন্ত তিনটি পিআইসিতে অর্ধকোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এটা এক প্রকার হরিলুট। প্রকল্প বরাদ্ধ দেওয়ার আগে সঠিকভাবে সার্ভে করা হলে হরিলুটের কান্ড ঘটতো না।
বাঁধ নির্মাণের বিলম্বে শুরুর বিষয়টি স্বীকার করে কীর্তনখলা বাঁধের পিআইসি সজল দে জানান, চল্লিশ হাত গভীর কীর্তনখলা বাঁধ। একমাস ধরে ড্রেজার দিয়ে বাঁধের ক্লোজারে বালু উঠিয়ে দিচ্ছি। আরও ২০-২৫ দিন সময় লাগবে ওয়াটার লেভেল পর্যন্ত উঠতে। এরপর উপরের অংশ বেশী সময় লাগবে না।খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কাবিটা স্কীমের সভাপতি মো. সেলিম মিয়া জানান, সকল পিআইসিদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে যদি কেউ অবহেলা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে।মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা স্কীমের উপজেলা সভাপতি মো. শাহ আলম মিয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা রলা সম্ভব হয়নি। তিনি মোবাইল রিসিভ করেন নি।নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান জানান, এরই মধ্যে জেলা কমিটির সভা হয়েছে। যারা প্রকল্পের কাজে অবহেলা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুত কাজ সমাপ্ত করার জন্য সবাইকে বলা হয়েছে।
কিউএনবি/অনিমা/১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪/বিকাল ৪:৪৫