খাদিজার কাঁধে চেপেছে জীবন, বাঁচার জন্য চায় একটি থাকার ঘর।
মাঈদুল ইসলাম মুকুল, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
Update Time :
সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৩
৪৭৮
Time View
মাইদুল ইসলাম মুকুল ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম): প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে ডাক্তারের ভুল অপারেশনের বলি হয়ে পরিপূর্ণভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া খাদিজা বেগম এখন পরিবার এবং সমাজের বোঝা হয়ে উঠেছে। একে একে ত্যাগ করেছে সবাই। সন্তান, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন এখন কেউ তার পাশে নেই। কাঁধে চেপে বসেছে তার জীবন। জীবনের ভার বহন করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় খাদিজা।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারিয়া গ্রামের দিনমজুর খবিরুল এর মেয়ে খাদিজা মাত্র ২১ বছর বয়সে স্বামীকে হারায় । স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসে সে। গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে শুরু করে তার নতুন জীবন। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা:আহসান হাবিব তার কোমরে পরপর দুইটি অপারেশন করেন। তারপর থেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় সে।
ঢাকার শ্যামলীর নিউরো মেডিকেল কলেজের ডাক্তারা জানায়, তার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে উন্নত থেরাপিসহ ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন। সেই থেকে সুস্থ জীবনে জীবনে আর ফিরতে পারেনি খাদিজা । এ বিষয়ে গত জুন মাসের শেষ দিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকায় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রচারিত হলে ভূরুঙ্গামারীর আমেরিকা প্রবাসী একজন কৃতি সন্তান জনাব সাইফুর রহমান তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। ঢাকার পঙ্গু হসপিটালে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডাক্তাররা জানিয়ে দেন খাদিজা আর কখনোই হাঁটতে পারবে না।
দিনমজুর ছেলে এবং তার বউ খাদিজাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে অনেক আগেই।খাদিজারএকমাত্র মেয়ে থাকে শ্বশুর বাড়িতে। ছেলের কাছ থেকে বিতারিত হয়ে খাদিজার আশ্রয় হয় মেয়ের বাড়িতে। ঘরেই পায়খানা প্রসাব করা পঙ্গু, অক্ষম মাকে শশুর বাড়িতে বেশি দিন রাখতে পারিনি মেয়েও। এরপর খাদিজার আশ্রয় হয় মেয়ের শ্বশুর বাড়ির পাশে একটি ভাড়া রুমে। সেখানে নিঃসঙ্গ ও মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে খাদিজা। খাদিজাকে কামাত আঙ্গারিয়া গ্রামে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় স্থানীয়রা। কিন্তু দরিদ্র পিতার বাড়িতে থাকার আলাদা কোন ঘর না থাকায় বাবা মায়ের রুমেই একটি চৌকিতে আশ্রয় নেয় খাদিজা। কিন্তু খাদিজার পঙ্গুত্ব ও অক্ষমতার বোঝা মা বাবার কাছেও ভারী হতে থাকে তিন দিন। একসময় বিষিয়ে ওঠেন তারাও। শুরু হয় খাদিজার উপর নির্যাতন।
সারাদিন আর্তনাদ করার অপরাধে খাদিজার ডান কানে থাপ্পড় দিয়ে কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলেন তার নিজের গর্ভধারিণী মা। সেই থেকে ডান কানে শুনতে পায়না খাদিজা। জীবনের বোঝা দিন দিন ভারী হতে থাকলে গত নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখে খাদিজা আত্মহত্যার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে রাতে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশ্য। তিন দিন পর ভুরুঙ্গামারীর দেওয়ানের খামার মসজিদের সামনে থেকে নির্জিব অবস্থায় খাদিজাকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা। সেখান থেকে খাদিজাকে আবারও বাবার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। এখন বাবা-মায়ের থাকার রুমের কোনায় একটি চৌকিতে মানবেতর জীবন কাটছে তার ।
আমেরিকান প্রবাসী জনাব সাইফুর রহমান ইতিমধ্যে খাদিজাকে ফিজিও থেরাপি দেওয়ার জন্য কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং মাসিক কিছু অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন। তার যেহেতু দু’হাত সচল রয়েছে তাই খাদিজার জীবন জীবিকার জন্য একটি হ্যান্ড সেলাই মেশিনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার জন্য একটি আলাদা ঘর এবং একটি বাথরুমের প্রয়োজন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন করার একবছর পার হলেও একটি ঘর পাননি খাদিজা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তারা বলছেন, এটি সময়ের ব্যাপার। বরাদ্দ আসলে হয়তো ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে। খাদিজার দাবি, বাবা মায়ের রুমের পাশে যদি দানবীর কোন ব্যক্তি বা সংগঠন তার জন্য একটি রুম এবং একটি বাথরুমের ব্যবস্থা করে দেন তাহলে না খেয়ে- না দেয়েও বাকিটা জীবন তিনি কাটিয়ে দিতে পারবে সে।