ডেস্ক নিউজ : দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের অবদান চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের মূল কারিগর ব্যাংক। এর মধ্যে পোশাক খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। রপ্তানির এই শীর্ষ খাতে বিনিয়োগ করা ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিডেটও (এফএসআইবিএল) একটি। শুধু পোশাক খাতই নয়, বর্তমানে এমন কোনো খাত নেই, যে খাতে ব্যাংক বিনিয়োগ করেনি। এতশত অর্জনের দুঃখ একটাই, সেটা হচ্ছে খেলাপি বিনিয়োগ। যদি তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে ব্যাংক খাতের দুরাশা এবং নিরাশা কমে যাবে। এমন প্রত্যাশা এফএসআইবিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলীর। ব্যাংকটির ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে যুগান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদ বিশ্বাস।যুগান্তর : প্রতিষ্ঠার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কী কী অর্জন হয়েছে?
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক লি. নামে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছে ১৯৯৯ সালের ২৫ অক্টোবর। যা ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়ে যাত্রা অব্যাহত আছে। সারা দেশে ২০০টি পূর্ণাঙ্গ শাখা, ১৫২টি উপশাখা, ৮৪টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ২১০টি নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ২০২১ সালে আমানতের অঙ্ক ছিল ৪৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা, যা বর্তমানে কিছুটা বেড়ে ৪৮ হাজার ৮৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। যুগান্তর : দেশের ব্যাংক খাত সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : ব্যাংক খাতের প্রচুর অর্জন। কিন্তু সে অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে খেলাপি বিনিয়োগের কাছে। অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডের প্রাণ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো প্রত্যক্ষভাবে অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও আর্থিক পুনরুদ্ধারেও ব্যাংক খাতের সুসংগঠিত কার্যপ্রস্তুতি প্রয়োজন। দেশের ব্যাংক সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা এবং প্রকৃত অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে এসব স্বার্থের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। ২০২১ সালে সামগ্রিক ব্যাংক খাতের আমানত ও বিনিয়োগে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা এ বছরেও অব্যাহত রয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত ও শৃঙ্খলিত কর্মকাণ্ড এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো গ্রাহক ও সেবা বাড়ানো সহজতর হয়েছে। যদি খেলাপি বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবে ব্যাংক খাতের সব দুরাশা দূর হয়ে যাবে।যুগান্তর : প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মকে আরও সম্প্রসারিত করেছে। রয়েছে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা। এফএসআইবিএল ‘ক্লাউড অ্যাপস’-এর ফ্রিডম ফিচারের মাধ্যমে একজন গ্রাহক ঘরে বসেই ‘ই কেওয়াইসি’ ফরম পূরণসহ নিজেই নিজের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। এছাড়া অ্যাপসটি ব্যবহার করে সব ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নগদ’ ও ‘বিকাশ’-এ ব্যালেন্স ট্রান্সফার, ডিপিডিসি, ডেসকো এবং ঢাকা ওয়াসা বিল পেমেন্ট। অটোমেটেড চালান (এ-চালান) এর মাধ্যমে পাসপোর্ট ফি, বিআরটিএ ফি, ট্যাক্স, ভ্যাট পরিশোধসহ ১৯৬ ধরনের সরকারি চালান ফি প্রদান করা যায়। ভিসা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সব ধরনের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
এসব কার্ডধারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিসকাউন্ট সুবিধা পেয়ে থাকেন। সিআরএম মেশিনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ক্যাশ জমা ও উত্তোলন করতে পারেন গ্রাহক। এছাড়া নাানাবিধ সময়োপযোগী সেবা প্রদানের মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকসেবা নিশ্চিতে সব সময় বদ্ধপরিকর। জনসাধারণের দোরগোড়ায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসছি ‘ফার্স্ট ক্যাশ’ যা ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গ্রাহকদের হাতে তুলে দিতে পারব। বাজারে প্রচলিত অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অধিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সমন্বয়ে সব মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে হাজির হবে ‘ফার্স্ট ক্যাশ’। যুগান্তর : আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ব্যাংকের বিস্তৃতি বাড়ানোর পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ‘সবার জন্য সব সময়’ নামে দেশব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে আসছি, যার মাধ্যমে দেশের সব শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, বাজার ও কল-কারখানায় আকর্ষণীয় উপহার প্রদানসহ চলতি, সঞ্চয়ী ও অন্যান্য ব্যাংক হিসাব খোলার সুবিধা করে দিচ্ছি। এছাড়া নতুন শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি করছি। যুগান্তর : ব্যাংক খাতের সার্বিক উন্নয়নে আরও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : আইসিটিবিষয়ক উন্নয়ন বা নিরাপদ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংসেবা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের ব্যবহার, সাসটেইনেবল বা গ্রিন ফাইন্যান্স নিশ্চিতকরণসহ সময়োপযোগী আরও পদক্ষেপ নেওয়া বা পরিবর্তন আনা আসলেই জরুরি। অপরদিকে খেলাপি বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিতকরণ, টেকসই এবং গ্রিন বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সব কমপ্লায়েন্স ইস্যু পরিপালনসহ আরও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করা যেতে পারে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কেমন পরিবর্তন এনেছেন? সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী : ২০১৫ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গ্রাহকদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছি। নতুন শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি, এফএসআইবিএল ক্লাউড অ্যাপস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম ব্যাংকিং, এ চালানসহ নানাবিধ আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধার মাধ্যমে সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা প্রদান নিশ্চিত করেছি। ২০১৫ সালে ব্যাংকের সম্পদের অঙ্ক যেখানে ছিল ২৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা, ২০২১ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায়। ২০১৫ সালে ব্যাংকের আমানতের অঙ্ক ছিল ২৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা, ২০২১ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকায়। ২০১৫ সালে ব্যাংকের বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ১৮ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা, ২০২১ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকায়।
কিউএনবি/আয়শা/১৯ অক্টোবর ২০২২,খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৫:৩৩ে