আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক অপরাধবিচারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইন বিশেষজ্ঞ ও আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লে। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
নাভি পিল্লেকে নোবেল দেওয়ার ঘোষণার দিনই আইসিসির বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক এই আদালতের বিরোধিতা করে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এর আগে আইসিসির কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন। এবার আদালতকে সেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ আইসিসিকে কখনোই দেবেন না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য, এ কারণেই আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আইসিসির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ এবং আদালটির সম্পদ ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির তদন্ত নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল। পরে ওই তদন্ত বন্ধ করে দেয় আদালতটি।
২০০২ সালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিসি। বর্তমানে আদালটির সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১২৫। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ আইসিসির সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোরও প্রায় সব সদস্য এই আদালতের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অনেকেও আইসিসিকে সমর্থন করে আসছে। আদালটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো—দুই জোটেরই সদস্য।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ সমাধানের সুযোগ আইসিসি ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে দেরি করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
আইসিসির ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদেরও পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। রুবিও সতর্ক করে বলেন, আইসিসিকে তার হুমকি বন্ধ করতে হবে, নতুবা যুক্তরাষ্ট্র আদালটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেবে।
তবে নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষায় দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু লাইসেন্স দেবে। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রমে সাময়িক ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কাজ করার ওপর বিধিনিষেধ তৈরি হতে পারে। এর আওতায় ব্যাংক হিসাব বন্ধ, বীমা সেবা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সহযোগিতা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় অবশ্য গত কয়েক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইসিসি। আদালতটি মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের বিকল্প হিসেবে উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবীমার বিকল্প ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিলার ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি সদস্য দেশগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ‘ব্লকিং ব্যবস্থা’ চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে নাভি পিল্লেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়ছে, তখন এই পুরস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার মানুষকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত বলেও উল্লেখ করেছে কমিটি।
কিউএনবি/অনিমা/০৯ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ১১:৫৪