আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সিদ্ধান্ত। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ঘোষণার পর পেন্টাগন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে এই দণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। তবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া ও অন্যান্য প্রশ্নও রয়েছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
১৩ জনকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড
নিদাল হাসান ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মেজর এবং পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেন তিনি। এ ঘটনায় আহত হন আরও ৩২ জন। হামলার সময় ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে সেনাসদস্যরা সামরিক দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে হাসান আহত হন। পরে তাকে আটক করা হয়।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে হাসানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচার চলাকালে তিনি নিজেই নিজের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন এবং হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেন। তার দাবি ছিল, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের মোতায়েন ঠেকানো এবং মুসলিমদের রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। আদালতে তার এই বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি।
৬৫ বছরেরও বেশি সময় পর সামরিক মৃত্যুদণ্ড
হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিচারব্যবস্থার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে যাচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৬১ সালে। অন্যদিকে, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ১৯৪৫ সালে।
দীর্ঘ বিরতির পর এই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ ধরনের সম্প্রচার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বাস্তবতা সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দিতে পারে। তবে অন্যদের আশঙ্কা, এতে বিচারিক শাস্তি জনসমক্ষে প্রদর্শনীর বিষয়ে পরিণত হতে পারে এবং দণ্ডিত ব্যক্তির মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
মানবাধিকার ও নৈতিকতার প্রশ্ন
ইরানসহ বিভিন্ন দেশে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা করে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সমালোচনা করেছিলেন। ফলে তার প্রশাসনের অধীনে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে সব বিশেষজ্ঞের অবস্থান এক নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, মৃত্যুদণ্ডের বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে এলে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সমালোচকদের প্রশ্ন—শাস্তি কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা কি সত্যিই জনস্বার্থে প্রয়োজন, নাকি এটি শাস্তিকে প্রদর্শনীর রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে?
নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত তারিখ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই এ সিদ্ধান্তের আইনি, নৈতিক ও মানবাধিকারগত দিক নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এই সম্প্রচার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং তা বিশ্বজুড়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
কিউএনবি/অনিমা/০৯ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ১১:৪৫