ডেস্কনিউজঃ সতের বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ গ্রহণের পর সম্প্রতি পূর্ণ হলো এই নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন।
প্রথম ১০০ দিনে এই সরকারের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন।
সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) থেকে একটি বিশেষ ‘ই-বুক’ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে এই স্বল্প সময়ে সরকার প্রায় ২০০টি নীতিগত ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রায় ৬২ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পথচলা ছিল একদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দ্রুত তৎপরতা, অন্যদিকে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি এক কঠিন পরীক্ষা।
সরকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরুর প্রথমেই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নীপরীক্ষা ছিল বিগত দেড় দশকের লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং রিজার্ভ সংকটে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তোলা।
আলোচিত ১০০ দিনে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড (কৃষক কার্ড), স্পোর্টস কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করেছে বিএনপি সরকার।
কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণ মওকুফ সুবিধা এবং দেশের নদী-খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু হয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য আর্থিক সম্মানি ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়া সহজ করতে ‘ই-বেইল বন্ড’ (অনলাইন জামিন ব্যবস্থা) চালু করা হয়েছে। শুধু তাই নয় ভিআইপি সংস্কৃতি পরিহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল সীমিত করা এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের নির্দেশ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
এদিকে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নীপরীক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছিল। প্রথম ১০০ দিনে সরকার ব্যাকিং সেক্টর ও রাজস্ব খাতে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ১০০ দিনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকারের প্রকৃত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সক্ষমতা বোঝা যাবে আসন্ন পূর্ণাঙ্গ বাজেটের অগ্রাধিকার ও নীতিমালার মাধ্যমে।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনো উদ্বেগ না কাটলেও সরকারের শতভাগ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ ছিল। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের আশা করা হলেও বাস্তব চিত্র এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার নজির তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং ঢাকার পল্লবীতে শিশু হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি তদারকি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, দখলদারিত্বের চেষ্টা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল দমন করা সরকারের জন্য এখনো একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি করা ‘জুলাই চার্টার ২০২৫’-এর আলোকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে আমূল সংস্কারের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা নির্বাচিত সরকারের অধীনে কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
যদিও বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের শাসনকাল এটি মূলত ছিল সরকারের দিক-নির্দেশনা নির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা। অনেকগুলো ইতিবাচক ও প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগের সূচনা হলেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো সরকারের সামনে বিশাল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। একটি জবাবদিহিমূলক ও সেবামূলক রাষ্ট্র গঠনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার আগামী দিনগুলোতে কতটা সফল হবে, তা সময়ের আবর্তেই প্রমাণিত হবে।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট ১০০ দিনে দূর করা অসম্ভব হলেও, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তির প্রত্যাশা অনেক বেশি, যা সরকারের ওপর এক ধরণের অদৃশ্য চাপ তৈরি করছে। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের খতিয়ান বলছে, সরকারের নিয়ত ও সংস্কারের রূপরেখা সঠিক পথেই রয়েছে। তবে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখতে না পারলে এই সংস্কার উদ্যোগগুলো কেবল নীতিমালার স্তূপ হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আসন্ন পূর্ণাঙ্গ বাজেট এবং পরবর্তী ৬ মাসের কার্যক্রমই নির্ধারণ করবে এই নতুন যাত্রা কতটা টেকসই হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিউএনবি/বিপুল/২৭.০৫.২০২৬/রাত ৮.৪০