আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েও শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০ দিনের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা ভিন্ন চোখে দেখছেন। ট্রাম্পের এই পিছু হটা কোনো মানবিক কারণে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে তেলের বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ। ট্রাম্প এই যুদ্ধকে লাশের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং তেলের ব্যারেল এবং শেয়ার বাজারের সূচক দিয়ে পরিমাপ করছেন।
গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিশ্ব এক ভয়াবহ আগুনের অপেক্ষায় ছিল। আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল যে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু যখনই ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানালো যে, হামলা হলে তার প্রভাব শুধু তেহরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং পুরো অঞ্চলের জ্বালানি করিডোর এবং পারস্য উপসাগর জ্বলবে, তখনই ট্রাম্প দমে যান। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই যুদ্ধ হবে ‘সিস্টেমিক’ বা পদ্ধতিগত, যা পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেবে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই ট্রাম্পকে প্রথমবারের মতো পিছু হটতে দেখা গেল।
এই যুদ্ধের একটি অদ্ভুত ছন্দ লক্ষ্য করা গেছে—যখনই আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ হয়, তখনই যুদ্ধের হুমকি বা উত্তেজনা বাড়ে। আবার সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে বাজার খোলার আগেই সেই সুর নরম হয়ে আসে। ইরানি পর্যবেক্ষকরা একে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন’ হিসেবে দেখছেন যার মূল কেন্দ্রবিন্দু অর্থনীতি।
ট্রাম্প যখন দেখলেন মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ধসে পড়ছে বা মিত্র দেশগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে, তখন তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি। কিন্তু যখনই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেলের বাজারে ধস নামার উপক্রম হলো, তখনই তিনি আলোচনার কথা বলে সময় চাইলেন। তার কাছে একটি সমাজের জীবনের চেয়ে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম বেশি বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই বিরতি মানেই শান্তি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে একটি কৌশলগত চাল। বাজারকে শান্ত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি আরও সুসংহত করার জন্য এই সময়টুকুকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা, বিমানবাহী রণতরী এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াবাহী বাহিনী ওই অঞ্চলে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। মুখে স্থগিতাদেশের কথা বললেও ইসফাহান ও খোররামশহর অঞ্চলে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরান এখন বুঝতে পেরেছে যে তাদের হাতে থাকা ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্ডটি যেকোনো পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। কারণ পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। অন্যদিকে, ইসরাইল এবং লিন্ডসে গ্রাহামের মতো মার্কিন যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদরা চাচ্ছেন এই যুদ্ধ যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই জটিল সমীকরণে ট্রাম্প হয়তো সাময়িকভাবে চোখ বন্ধ করেছেন বা ‘ব্লিংক’ করেছেন, কিন্তু ইতিহাস বলে তিনি একই কৌশল বারবার ব্যবহার করেন। ১০ দিনের এই সময়সীমা আসলে কোনো সমাধান নয়, বরং পরবর্তী বড় কোনো সংঘাতের আগের এক ছমছমে নীরবতা মাত্র।
কিউএনবি/আয়শা/২৭ মার্চ ২০২৬,/বিকাল ৪:০৪