টেকনোক্র্যাট (Technocrat) বলতে বুঝায় এমন ব্যক্তিকে যিনি রাজনীতিবিদ না হয়েও নির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তিগত, পেশাগত বা একাডেমিক দক্ষতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা বা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
অর্থাৎ যারা সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হননি, কিন্তু বিশেষ দক্ষতা বা যোগ্যতার কারণে মন্ত্রিসভায় স্থান পান, তারাই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার অনধিক এক-দশমাংশ সদস্যকে সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পারেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাদের অবশ্যই সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীই মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যদের মনোনীত করেন। তবে তাকে নির্বাচিত এমপিদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভার ১০ ভাগের ৯ ভাগ সদস্য রাখতেই হবে। বাকি এক ভাগ তিনি চাইলে টেকনোক্র্যাট সদস্য রাখতে পারেন।
সাধারণত বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বা বিশেষ অবদানের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী এই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। নিয়মানুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের আগে বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে এই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হয়।
নতুন মন্ত্রিসভায় কারা হচ্ছেন টেকনোক্যাট মন্ত্রী
৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী থাকছেন। এর মধ্যে টেকনোক্র্যাট কোটায় দুজন মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী হিসেবে আছেন আমিনুর রশিদ ইয়াছিন এবং ড. খলিলুর রহমান। আর আমিনুল হককে করা হচ্ছে প্রতিমন্ত্রী।
আমিনুর রশীদ ইয়াছিন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াছিন কুমিল্লা–৬ (সদর) আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে এই আসনে দলের মনোনয়ন পান দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও গত ১৯ জানুয়ারি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াসিন। তিনি কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসনে থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-৬ থেকে পরাজিত হন।
ড. খুলিলুর রহমান
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন ড. খলিলুর রহমান।
২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান খলিলুর রহমান। পরে খলিলুর রহমানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া হয়।
ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ড. খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে দায়িত্ব পালন করেন খলিলুর রহমান। ১৯৮৫ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি করা হয় তাকে। এছাড়া ১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন।
আমিনুল হক
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচন করেছিলেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াত ইসলামের প্রার্থী কর্নেল (অব) আব্দুল বাতেনের কাছে হেরে যান। কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে কিংবা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী কখনো হননি। আমিনুল হকই প্রথম।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সাবেক তারকা ফুটবলারদের মধ্যে মেজর হাফিজই প্রথম মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন পর আরেক সাবেক জাতীয় ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার হিসেবে মন্ত্রী হতে চলছেন।