ডেস্ক নিউজ : বিএনপি প্রার্থীদের জন্য অশনীসংকেত বিদ্রোহীরা। বরিশাল বিভাগের ৩টি আসনে এমনই পরিস্থিতি। দল থেকে বহিষ্কারের পরও মাঠ না ছাড়া এই বিদ্রোহীদের কারণে ভাগ হচ্ছে বিএনপির ভোট। দলের অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে কাজ করছেন বিদ্রোহীদের পক্ষে। শত হুমকি-ধমকি, কমিটি বিলুপ্ত আর বহিষ্কারের পরও ফিরছেন না তারা। এভাবে চলতে থাকলে তিনটি আসনেই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। এই শঙ্কা দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের। যদিও তা মানতে নারাজ ধানের শীষের প্রার্থীরা। বিদ্রোহীদের কারণে ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দাবি তাদের।
আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা হিসাবে পরিচিত পটুয়াখালী-৩-এ কখনোই জেতেনি বিএনপি। ধানের শীষ প্রশ্নে বন্ধ্যা এই এলাকায় দলকে শক্তিশালী করেছেন মামুন। বহু বছরের চেষ্টায় গড়েছেন বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। মামুনের তৈরি করা সেই মাঠে হঠাৎ করে নুরের উপস্থিতি যেন কোনোভাবেই মানতে পারছেন না স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। সেই মানতে না পারা থেকেই বিদ্রোহ ছড়িয়েছে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। গলাচিপা পৌর বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘তিনি (নুর) তো জাতীয় নেতা। নির্বাচন করছেন নিজের জন্মস্থানে। তার কেন অন্য দলের সমর্থন লাগবে? এতেই তো প্রমাণ হয় এলাকায় তার জনপ্রিয়তা কতটুকু। তাছাড়া আমরা তো ধানের শীষের বিরুদ্ধে নির্বাচন করছি না। করছি ট্রাকের বিরুদ্ধে। ইনশাআল্লাহ হাসান মামুনের জয় নিয়েই ফিরব ঘরে।’ প্রায় একই কথা বলেন দশমিনা উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ভোটযুদ্ধ প্রশ্নে হাসান মামুন বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি প্রমাণ হবে নির্বাচনি এলাকার মানুষ কাকে বেশি ভালোবাসে।’
তবে বিদ্রোহী প্রার্থী প্রশ্নে নুরুল হক নুর বলেন, ‘বিএনপির একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে তার (হাসান মামুন) সঙ্গে। সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা কিন্তু ট্রাকের পক্ষেই কাজ করছে। দলের চেয়ারম্যান তথা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীর পক্ষে বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা থাকবে না-এটাই স্বাভাবিক। বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ে ভাবছি না, নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে ১২ ফেব্রুয়ারি তার প্রমাণ পাবেন।’ এই আসনে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নুরুল হক নুর আর হাসান মামুনের মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আহম্মেদ সোহেল সুমন মঞ্জুরের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলটি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত মাহমুদ হোসাইন ভিপি মাহমুদ। দুজনের বাড়ি একই উপজেলায়। ফলে এখানে ভাগ হচ্ছে বিএনপির ভোট। তবে বাকি দুই উপজেলায়ও রয়েছে মাহমুদের শক্ত অবস্থান। কিংবদন্তি সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভাতিজা ভিপি মাহমুদ। অর্থাৎ সাবেক মন্ত্রী ও জেপি (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই তিনি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবার নির্বাচন করছেন না। ফলে ছোট ভাই তথা এলাকার ঐতিহ্যবাহী মানিক মিয়া পরিবারের সন্তান হিসাবে মাহমুদকেই ধরা হচ্ছে তার প্রার্থী হিসাবে। ’৯০-পরবর্তী কোনো নির্বাচনে এখানে জিতেনি বিএনপি। জনসমর্থনের দখল ছিল আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর হাতে। সর্বশেষ ২৪-এর নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম ঘটলেও ৩ উপজেলাতেই রয়েছে মঞ্জুর নিজস্ব ভোট ব্যাংক। এর সঙ্গে ধানের শীষের ভাগ হওয়া ভোট যোগ হয়ে মাহমুদকে বানিয়েছে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কাজ করছেন তার পক্ষে। ফলে ক্রমশ অমসৃণ হয়ে পড়ছে ধানের শীষের বিজয়।
ভোটযুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রশ্নে ভিপি মাহমুদ বলেন, ‘আমার প্রতিটি সভা আর উঠান বৈঠক দেখুন। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমেছে ‘ঘোড়া’ প্রতীকের পক্ষে। এটা কেবল ভান্ডারিয়া নয়, কাউখালী আর নেসারাবাদেও। পাশাপাশি অন্যদের করা সভা-সমাবেশগুলো মেলান, তাহলেই প্রমাণ পেয়ে যাবেন ভোটাররা কার পক্ষে।’তবে নির্বাচনি এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীর অবস্থান মানতে রাজি নন ধানের শীষের প্রার্থী সুমন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির পক্ষে এবার যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাতে বাকিরা স্রেফ ভেসে যাবে। ধানের শীষ প্রশ্নে আমি কাউকেই থ্রেট মনে করছি না।’ দলের কেউ ঘোড়া প্রতীকের পক্ষে কাজ করছে না বলেও দাবি করেন তিনি। এই আসনে সুমন ও ভিপি মাহমুদ ছাড়াও আলোচিত প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র জামায়াতে ইসলামীর শামিম সাঈদী।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক এমপি জহিরুদ্দিন স্বপনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে আছেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। এরই মধ্যে তাকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যসহ দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারপরও বেশ জোরেশোরেই নির্বাচনি মাঠে আছেন তিনি। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাসিন্দা সোবাহানকে এর আগে ২০০৮-এর নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মাওলানা কামরুল ইসলাম।
এর আগে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে পরাজিত করে এমপি হওয়া জহিরুদ্দিন স্বপনের এলাকায় রয়েছে শক্ত অবস্থান। বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। বিএনপির ভোট ভাগ হলে সুবিধা যেতে পারে জামায়াতের ঘরে। তবে শেষ পর্যন্ত স্বপন তার অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে পারবেন বলে মনে করছেন ভোটাররা। যুগান্তরকে ইঞ্জিনিয়ার সোবাহান বলেন, ‘এটা আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। বয়সের কারণেই বলছি এই কথা। জনগণের ওপর আমার ভরসা আছে। তারা নিশ্চয়ই আমায় বিমুখ করবে না।’ বিএনপির প্রার্থী জহিরুদ্দিন স্বপন বলেন, ‘বিএনপির সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে। ইনশাআল্লাহ বিপুল ভোটের ব্যবধানে এখানে জিতবে বিএনপি।’ গৌরনদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা বলেন, ‘দলের পদ-পদবিধারী সব নেতাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এখানে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাই ধানের শীষেই ভোট দেবেন।’
কিউএনবি/আয়শা/২৭ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:০৪