শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম
হাতিয়াতে জোয়ারে ভেসে আসা মরদেহ পড়ে রইল কেওড়া বাগানে ২১ রানের ব্যবধানে নেই ৫ উইকেট ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা শেষ সিনেমা ‘জন নায়গন’ দিয়ে বিজয় কি পারবেন নিজের রেকর্ড ভাঙতে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ে খুলে পানি নিস্কাশনের প্রস্তুতি, নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান লালমনিরহাটে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ত্রাণমন্ত্রী দুলুর আর্থিক ও ত্রাণ সহায়তা ‘৩ ইডিয়টস’-এর ফুংসুখ ওয়াংড়ু চরিত্রটি সোনাম ওয়াংচুককে নিয়ে নয়: আমির খান সোনাক্ষী-জহিরের প্রেম নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সালমান প্রাথমিক বৃত্তিতে উপজেলায় শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষে আটোয়ারী কিন্ডার গার্টেন সংসদের উত্তাপ গড়াচ্ছে রাজপথে

ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় সুফিদের বহুমুখী অবদান

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৪
  • ৫৭ Time View

ডেস্ক নিউজ : জ্ঞানই ছিল ভারতবর্ষের সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক রাহ্বারদের সবচেয়ে ধ্যান-জ্ঞান ও কামনা-বাসনা। তাঁরা জ্ঞানের প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং জ্ঞানের সেবা করেছেন। তাঁদের অনেকেই ছিলেন সাহিত্যের বোধ ও উচ্চতর জ্ঞানগত দক্ষতার অধিকারী। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ইলম তথা জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় লাভ করা সম্ভব নয়।

মূর্খ সুফিরা শয়তানের ক্রীড়ানক। এ জন্য দেখা গেছে, বহু প্রতিভাবান ও যোগ্য ব্যক্তিদের তাঁরা লেখাপড়া সম্পন্ন করার আগে দ্বিন প্রচারের অনুমতি তথা খিলাফত দান করেননি। প্রকৃতপক্ষে অতীতের শিক্ষা আন্দোলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণকে পীর-মাশায়েখরা উৎসাহিত করেছেন, নানাভাবে অবদান রেখেছেন। হয়তো তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে করেছেন বা পরোক্ষভাবে করেছেন।

কাজি আবদুল মুক্তাদির কিন্ধি ও শায়খ আহমদ থানেশ্বরি (রহ.) ছিলেন শায়খ নাসিরুদ্দিন ‘চেরাগে দেহলভি’ (রহ.)-এর শিষ্য এবং একাদশ শতকের প্রখ্যাত শিক্ষক। তাঁরা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দান করেছেন। শায়খ লুত্ফুল্লাহ কুয়েরভি (রহ.) ছিলেন চিশতিয়া তরিকার বিশিষ্ট বুজুর্গ। তাঁর শিক্ষা কার্যক্রমের ধারা ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

বেশির ভাগ সময় আমরা মাদরাসা ও খানকাকে অঙ্গাঙ্গিভাবে চলতে দেখেছি। জৌনপুরের খানকায়ে রশিদিয়া ও লখনউর শায়খ পীর মুহাম্মদের মাদরাসা এবং দেহলভির শায়খ ওয়ালিউল্লাহ বিন আবদুর রহিম (রহ.)-এর মাদরাসা ও গাঙ্গুহের শায়খ রশিদ আহমদ (রহ.)-এর খানকা জ্ঞানের শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার দীক্ষার সমন্বয়ের উত্তম দৃষ্টান্ত।

এসব মাশায়েখ ও তাঁদের খানকার শিক্ষাদান পদ্ধতির অনন্য দিক হলো, তাঁরা মনুষ্যত্ব, মানবিকতা ও আল্লাহপ্রেমের সহযোগে ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার ঘটান। একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিদ্যালয় ছিল তাঁদের খানকাগুলো। যেখানে হাজারো মানুষের আশ্রয় মিলত।

তবে তাঁদের শিক্ষা ছিল প্রাতিষ্ঠানিকতার ভার ও কাঠামো মুক্ত। ফলে সহজেই যে কেউ অংশ নিতে পারত। আবার স্বল্প ও দীর্ঘ সময়ের জন্য অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকত। তারা সেখানে খাদ্য-পানীয় ও জীবনোপকরণ পেত। তাদের দস্তরখানে সৃষ্টি হতো অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের উদার দস্তরখানে একত্র হতো শত্রু ও মিত্র, আত্মীয় ও অনাত্মীয়, ধনী ও দরিদ্র্য। শায়খ নিজামুদ্দিনের দস্তরখান সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। উদারতা, বাহারি খাবার, স্বাদ ও সুন্দর পরিবেশনার ক্ষেত্রে তা উপমায় পরিণত হয়েছিল।

খানকা ও বিদ্যালয়গুলো পরিচালনায় তাঁরা শাসকদের সহযোগিতার প্রত্যাখ্যান করতেন এবং জনগণকে তাতে সম্পৃক্ত করতেন। যেন শাসকের প্রভাব থেকে আত্মরক্ষা করা যায় এবং জনসাধারণের দ্বিনি চেতনা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। শায়খ সাইয়েদ মুহাম্মদ সাঈদ আম্বালাভি (রহ.) ছিলেন খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকের মনীষী। তাঁর জীবনী রচয়িতারা লেখেন, ‘তাঁর খানকায় প্রথম যুগেই যারা ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকত, তাদের সংখ্যা পাঁচ শর চেয়ে কম ছিল না এবং সমপরিমাণ লোক সব সময় যাওয়া-আসার মধ্যে থাকত। একবার সম্রাট ফররুখ শিয়ারের আমির রওশন দৌলা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে খানকা নির্মাণের জন্য ৬০ হাজার রুপি উপহার দেন। শায়খ রওশন দৌলাকে বলেন, অর্থগুলো এক জায়গায় রেখে তিনি যেন বিশ্রামে যান। ফলে রওশন দৌলা ফিরে যান এবং শায়খ অসহায় মানুষদের খবর দেন। তিনি আম্বালাহ, থানেশ্বর, সেরহিন্দ ও পানিপথের এতিম, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের ভেতর সমুদয় অর্থ বিতরণ করে দেন। তাঁর হাতে একটি অর্থও রাখলেন না। এরপর রওশন দৌলা এলে শায়খ তাঁকে বলেন, ‘অসহায় মানুষ ও যারা নিজেদের আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত রেখেছে, তাদের সেবা করার সওয়াব ভবন নির্মাণের চেয়ে বেশি।’ একবার শায়খ সাইয়েদ মুহাম্মদ সাঈদ (রহ.)-এর কাছে সম্রাট মুহাম্মদ ফররুখ শিয়ার, আমির রওশন আলী ও আমির আবদুল্লাহ খানের চিঠি পৌঁছেয় তিন লাখ রুপিসহ। তিনি পুরো টাকা প্রতিবেশী গ্রাম ও এলাকাগুলোর অধিবাসীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন।

সুফি সাধকদের খানকা ও বিদ্যালয়গুলো ছিল বৈষম্যহীন এবং সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য উন্মুক্ত। সাইয়েদ মানাজির আহসান গিলানি (রহ.) যথার্থ বলেছেন, ‘এসব খানকাই ছিল ধনী-গরিবের মধ্যে একমাত্র সেতুবন্ধন। সুফি সাধক ও মাশায়েখদের দরবার ছিল এমন ভাণ্ডার, যেখানে রাজা-বাদশাহরাও খাজনা জমা দিতেন। যুবরাজ খিজির খান শায়খ নিজামুদ্দিনের দরবারে উপস্থিত হয়ে উপকৃত হতেন। এমনিভাবে সম্রাট আলাউদ্দিন, যিনি সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে কর আদায় করতেন, তিনি একটি দরবারে কর জমা দিতে বাধ্য ছিলেন। ধনী ও দরিদ্রের এই ঐক্য ও মেলবন্ধন সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখ, যাঁদের দরবারে ধনী ও দরিদ্র সবাই সমানভাবে উপস্থিত হতো এবং উপকৃত হওয়ার সুযোগ পেত। তাঁদের মাধ্যমে অসহায় মানুষের অভাব পূরণ হতো। বাস্তবতা হলো ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন যুগ যায়নি এবং ভারতের এমন কোনো অঞ্চল ছিল না যেখানে পীর-মাশায়েখ ও সুফিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিম্নোক্ত হাদিস বাস্তবায়ন করেননি। তাহলো ‘জাকাত তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করো’। সুতরাং তাঁরা ছিলেন দরিদ্র, অসহায় ও নিঃস্ব মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষে সুফিবাদের ইতিহাস সাধনা, অল্পে তুষ্টি, আত্মমর্যাদা, সম্মান, উচ্চাঙ্ক্ষা ও পরোপকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরপুর। এ দেশের কোনো সুফিধারাই এসব গুণ ও তার দৃষ্টান্ত থেকে শূন্য নয়। তাঁরা নিজেদের জীবনাচারের মাধ্যমেও ইসলামের শিক্ষাকে তুলে ধরেছেন। যেমনটি মহানবী (সা.)-এর ব্যাপারে বলা হয়। নকশাবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার বিশিষ্ট বুজুর্গ ছিলেন শায়খ শামসুদ্দিন হাবিবুল্লাহ (রহ.)। তিনি মির্জা জানে জানাঁ দেহলভি নামে পরিচিত ছিলেন। একবার ভারত সম্রাট তাঁকে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে সুবিশাল রাজত্ব দান করেছেন। আমি চাই, আপনি তা থেকে কিছু অংশ গ্রহণ করুন। তিনি বলেন, আল্লাহ দুনিয়াকে নিচু ও হীন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বলুন! দুনিয়ার ভোগবিলাস অতি সামান্য। আপনারা পৃথিবীর মহাদেশগুলোর একটি মহাদেশের ছোট্ট রাজত্ব লাভ করেছেন। সুতরাং আমি এই ছোট অংশে অনধিকার চর্চা করতে চাই না।

একবার ‘টুংকু’-এর শাসক নবাব মীর খান শায়খ গোলাম আলী দেহলভি (রহ.)-এর খানকার বার্ষিক সভার ব্যয়ভার গ্রহণের আবেদন করলেন। শায়খ তার উত্তরে একটি কবিতা লিখলেন। যার অর্থ নিম্নরূপ—‘আমরা দারিদ্র্য ও অল্পে তুষ্টিকে অবশ্যই ছোট করে দেখি না এবং তার সম্মানের ওপর আঁচড় কাটতে চাই না। তুমি মীর খানকে বোলো দাও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।’

তাঁদের এই নির্মোহ জীবনধারাও ছিল সাধারণ আলেম ও ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য উত্তম শিক্ষা।

তামিরে হায়াত থেকে আলেমা হাবিবা আক্তারের ভাষান্তর

কিউএনবি/অনিমা/২৩ অক্টোবর ২০২৪,/সকাল ১০:৩২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit