ডেস্ক নিউজ : আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানবজীবনে নানাবিধ নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটেছে। এসব চিকিৎসা-পদ্ধতির মধ্যে প্লাস্টিক সার্জারি ও কসমেটিক সার্জারি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুর্ঘটনা, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, জন্মগত ত্রুটি কিংবা কোনো জটিল রোগের ফলে মানবদেহে যে বিকৃতি সৃষ্টি হয়, তা সংশোধনের জন্য যেমন প্লাস্টিক সার্জারির আশ্রয় নেওয়া হয়, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি, আকর্ষণ বাড়ানো কিংবা ফ্যাশন ও আধুনিকতার অনুসরণে কসমেটিক সার্জারিও ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় একজন সচেতন মুসলমানের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, এ ধরনের সার্জারি কি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ? কোন ধরনের শল্য চিকিৎসা ইসলামে অনুমোদিত, আর কোনটি নিষিদ্ধ? চিকিৎসার নামে দেহে পরিবর্তনের সীমারেখা কতটুকু?
ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই মানবজীবনের কোনো দিকই তার দিক-নির্দেশনার বাইরে নয়। মানবদেহ, সৌন্দর্যবোধ, চিকিৎসা গ্রহণ, এমনকি দেহে পরিবর্তনের বিষয়েও ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
প্লাস্টিক সার্জারি ও কসমেটিক সার্জারি : মৌলিক পার্থক্য
ইসলামের বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রথমেই এই দুই ধরনের সার্জারির পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা জরুরি। কারণ একই নামের অন্তর্ভুক্ত হলেও উদ্দেশ্য ও প্রকৃতির ভিন্নতার কারণে হুকুমেও মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়।
প্লাস্টিক সার্জারি বলতে সেই সব শল্য চিকিৎসাকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য হলো মানবদেহে সৃষ্ট কোনো অস্বাভাবিকতা, বিকৃতি বা ক্ষতকে সম্ভবপর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
এই বিকৃতি বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি। যেমন-কোনো দুর্ঘটনায় কারো নাক বা মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করা, জন্মগতভাবে ঠোঁট কাটা শিশুর ঠোঁট সংশোধন করা, কিংবা আগুনে পুড়ে যাওয়া চামড়ার স্থানে নতুন চামড়া প্রতিস্থাপন করা-এসবই প্লাস্টিক সার্জারির অন্তর্ভুক্ত। এখানে মূল লক্ষ্য সৌন্দর্য প্রদর্শন নয়; বরং শারীরিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং রোগীকে দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার উপযোগী করা।
আর কসমেটিক সার্জারি হলো এমন শল্য চিকিৎসা, যা কোনো রোগ, বিকৃতি বা প্রকৃত শারীরিক ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি, আকর্ষণ বাড়ানো কিংবা নিজেকে অন্যদের তুলনায় অধিক সুন্দর করে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে করা হয়।
যেমন-স্বাভাবিক নাককে আরো ছোট বা ধারালো করা, মুখের ত্বক টান টান করার জন্য ফেসলিফট করা, ঠোঁট, বুক বা নিতম্ব অস্বাভাবিকভাবে বড় বা ছোট করা ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে দেহের বর্তমান অবস্থা চিকিৎসাগত দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ নয়; বরং মানসিক সন্তুষ্টি, ফ্যাশনের কারণে এ ধরনের পরিবর্তন করা হয়।
ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি : মানবদেহ ও পরিবর্তন
ইসলামে মানবদেহকে নিছক ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ এই দেহের মালিক নয়; বরং দায়িত্বশীল রক্ষক। তাই ইসলাম এমন কোনো পরিবর্তন অনুমোদন করে না, যা এই আমানতের অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হয়।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : আত-ত্বিন, আয়াত : ৪)
এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে মানুষের মৌলিক গঠন আল্লাহর হিকমতপূর্ণ সৃষ্টি। অপরদিকে কোরআনে শয়তানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে-‘আমি অবশ্যই তাদের আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১৯)
আরবের কাফিররা কোনো কোনো জন্তুর কান চিরে প্রতিমার নামে উৎসর্গ করত। এরূপ জন্তু ব্যবহার করাকে তারা জায়েজ মনে করত না। তাদের এই ভ্রান্ত রীতির প্রতিই আয়াতে ইশারা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটা শয়তান করায়। আল্লাহর সৃষ্টিকে ‘বিকৃত করা’ বলতে এই কান চিরে ফেলাকেও বোঝানো হতে পারে। তা ছাড়া হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) আরো কিছু কাজকে ‘সৃষ্টির বিকৃতি সাধন’ সাব্যস্ত করে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন-সেকালে নারীরা তাদের রূপচর্চার অংশ হিসেবে সুঁই ইত্যাদি দ্বারা খুঁচিয়ে শরীরে উল্কি আঁকত, চেহারার প্রাকৃতিক লোম (যা দূষণীয় পর্যায়ের বড় হতো না) তুলে ফেলত এবং কৃত্রিমভাবে দন্তরাজিকে ফাঁকা ফাঁকা করে ফেলত। এ সবই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনের অন্তর্ভুক্ত, যা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। (তাফসিরে তাওযিহুল কুরআন)
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্লাস্টিক সার্জারি
যেসব প্লাস্টিক সার্জারি চিকিৎসার প্রয়োজনে করা হয়, যেগুলোর মাধ্যমে শারীরিক কষ্ট লাঘব হয়, মানসিক যন্ত্রণা দূর হয় এবং দেহের কোনো অঙ্গকে তার স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনা হয়, সে প্লাস্টিক সার্জারি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ। ইসলাম রোগ নিরাময় ও চিকিৎসা গ্রহণকে উৎসাহিত করেছে। হাদিসে এসেছে : ‘তারা (সাহাবিরা) বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যদি (রোগীর) চিকিৎসা না করি, তবে কি আমাদের গুনাহ হবে? রাসুল (সা.) বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা করো। কেননা মহান আল্লাহ বার্ধক্য ছাড়া এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার সঙ্গে প্রতিষেধকেরও ব্যবস্থা করেননি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)
আরফাজা বিন আসাদ (রা.) বলেন, ‘জাহিলি যুগে ‘ইয়াওমুল কিলাব’ যুদ্ধে আমার নাক কেটে যায়। তখন আমি রুপার একটি নাক তৈরি করি; কিন্তু তা থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। অতঃপর রাসুল (সা.) আমাকে সোনার একটি নাক লাগানোর নির্দেশ দেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৭০)
এগুলো থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্লাস্টিক সার্জারি করার সুযোগ আছে।
অতএব দুর্ঘটনা, জন্মগত ত্রুটি, আগুনে পোড়া কিংবা অন্যভাবে গুরুতর বিকৃতির কারণে যদি প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়, তাহলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ।
কখন প্লাস্টিক সার্জারি জায়েজ নয়
যদি সার্জারির উদ্দেশ্য শুধু সাজসজ্জা, ফ্যাশনপ্রীতি ও সৌন্দর্য প্রদর্শন হয়, অর্থাৎ দেহের স্বাভাবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ইচ্ছামতো পরিবর্তন এনে (কথিত) বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এমন সার্জারি ইসলামের দৃষ্টিতে নাজায়েজ ও হারাম।
কারণ এসব পরিবর্তন মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক রূপান্তরের অন্তর্ভুক্ত, যা বয়সের সঙ্গে অনিবার্যভাবে ঘটতে থাকে। তাই কারো শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গ ছোট বা বড় করানো শরিয়তসম্মত নয়; বরং হাদিসে এ ধরনের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি কঠোর নিন্দা ও অভিশাপ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ লানত করেছেন ওই সব নারীর প্রতি, যারা অন্যের শরীরে উল্কি অঙ্কন করে, নিজ শরীরে উল্কি অঙ্কন করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রু উপড়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। (কারণ) এরা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি ঘটিয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৮৮৬)
এ ধরনের সার্জারির উদ্দেশ্য কোনো প্রকৃত চিকিৎসা বা ক্ষতি দূর করা নয়; বরং সৌন্দর্য ও তারুণ্য প্রদর্শন। ফলে এটি কোনো শরয়ি প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়; বরং নফসের অনুসরণে আল্লাহর সৃষ্টিতে অকারণ পরিবর্তন এবং অপরকে প্রতারণার শামিল। আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াজিদ (রহ.) এর সূত্রে নবী (সা.) থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি লুটতরাজ ও অঙ্গহানি ঘটাতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৫১৬)
অতএব সাজসজ্জা, ফ্যাশনপ্রীতি ও সৌন্দর্যের প্লাস্টিক সার্জারি বা কসমেটিক সার্জারি কোনোটাই জায়েজ নয়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ : জবাব নম্বর : ১৭০৭৯৬)
আল্লাহ তাআলা আমাদের এ ধরনের নাজায়েজ কর্ম থেকে বিরত রাখুন। আমিন।
লেখক : মুদাররসি, জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
কিউএনবি/অনিমা/২৬ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৬:২৭