মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মূল নকশা করেছিলেন রাও ফরমান আলী নামে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ এক কর্মকর্তা। যুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে সহজে জয় লাভ করা এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন ভবিষ্যতে আর কোনদিন মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই দেশের চেতনা শক্তির মূল উৎস বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার জন্য সারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তারা। তালিকায় ছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী এবং সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা।মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর পরাজয়ের পর ঢাকার গভর্নর হাউস থেকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর একটি ডাইরি উদ্ধার করা হয়। সেখানে অনেক নিহত ও নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নাম লেখা ছিল। মুলত: এ তালিকা অনুসরণ করেই মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এদেশের বুদ্ধিজীবীদেরকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও এর শেষ আঘাতটি আসে ১৪ ডিসেম্বর। সেদিন একযোগে বহু বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর সূচনা হয় দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে তার বাসা থেকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে উঠিয়ে নেওয়ার সময় মুখের কাপড় সরে গেলে প্রকাশ পায় আলবদরের অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের চেহারা। তাকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর চিনে ফেলার অন্যতম কারণ তিনি বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। এর একটু পরে সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে প্রখ্যাত নাট্যকার,শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং বাচিকশিল্পী মুনীর চৌধুরীকে তুলে নেয় আল বদর বাহিনী। সেদিন সন্ধ্যায় কায়েতটুলির বাসা থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক শহীদুল্লা কায়সারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল বদরের একটি দল বিশিষ্ট কবি ও কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ার পাশাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে হত্যা করে। এভাবে ১৪ ডিসেম্বর সেদিন অগণিত বুদ্ধিজীবীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর বাহিনী। ১৪ ডিসেম্বর ঠিক কতজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এর সঠিক তালিকা পাওয়া যায় না।এছাড়াও ১৫ ডিসেম্বর আল বদররা তুলে নেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফজলে রাব্বিকে । ১৬ ডিসেম্বর আল বদর সদস্যরা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স সাইন্স এন্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদকে। তাদের অনেকের লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। আবার অনেককে আর কখনো খুঁজেই পাওয়া যায়নি।২৫ শে মার্চ কালো রাত থেকে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে একের পর এক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও কেন ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকেই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করা হলো? এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন মনে করেন, ১৪ ডিসেম্বর কে বুদ্ধিজীবী দিবস করা হয়েছে এর কারণ এই দিনে একযোগে অনেক বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ বা সরকার বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যারা ৫২ সাল বা ৪৭ থেকে একটা বড় অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সকল আন্দোলনে, তাদেরকে সম্মান জানানোর জন্যই মূলতঃ এই দিনটিকে বেছে দেওয়া হয়েছে। বাংলাপিডিআর হিসাব মতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসে আল বদর, আল শামস ও রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোট ১ হাজার ১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার ও আল বদর বাহিনী। তবে ২০২০ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রাথমিক তালিকায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ১ হাজার ২২২ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে । ইতিহাসবিদরা বলছেন, সংখ্যার দিক থেকে বিবেচনা না করে যদি জনসংখ্যা আর মৃত্যুর হার হিসেবে হিসাব করা হয় তাহলে অন্যান্য ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতে আরো বেশি সংখ্যক বুদ্ধিজীবী মারা গেছেন কিন্তু এ বিষয়ে জেলাভিত্তিক ইতিহাস সংরক্ষণ না থাকায় নিজ জেলার মানুষজনও তাদের সেভাবে চেনে না। কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব এর নাম আমরা কুড়িগ্রামবাসী কতটুকু জানি? আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার (৩ জানুয়ারি ১৯৪৩- ৭ আগস্ট ১৯৭১) ছিলেন কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুড়িগ্রাম কলেজের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এই বুদ্ধিজীবী। তিনি শুধুমাত্র একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে একজন সক্রিয় সৈনিক। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার জন্য তিঁনি তাঁর ছাত্রদের সুসংগঠিত করার পরিকল্পনা করেন । এর কয়েকদিন পরই তিঁনি সপরিবারে কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে নিজ গ্রামে চলে যান এবং এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ওয়াহাব তালুকদার ১ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত বামনহাট যুব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। এবং পরবর্তীতে ৬নং সেক্টরের অধীন বামনহাট যুব শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।ভারতের বামনহাটে ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়শই তিঁনি তাঁর নিজ এলাকা ভুরুঙ্গামারী থানার সিংঝাড় গ্রামে আসতেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজ পরিবারের সাথে দেখা করা এবং নিজ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দেয়া। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট তিনি সিংঝাড় থেকে বামনহাটের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পথিমধ্যে বামনহাট থেকে আসা কয়েকজন সহকর্মীসহ সিংঝাড় গ্রামে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বগনী-সেতুতে অবস্থানরত একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। এমন সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একদল সিপাই সুপরিকল্পিতভাবে রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে অতর্কিত আক্রমণ করে। অতর্কিত এই আক্রমণে পুরো দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার রেললাইন ধরে দৌড়াতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনী তাকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকলে তিনি রেললাইনের পাশের জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ঠিকই খুঁজে বের করে এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। এরপর তাকে ফেলে দেয়া হয় পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায়। পরে ভারতীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বগনী নদীর কিনারে অবস্থিত কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়।
কিউএনবি/অনিমা/১৪ ডিসেম্বর ২০২৩,/দুপুর ২:৫০