লাইফ ষ্টাইল ডেস্ক : ঋতু পরিবর্তের কারণে সিজনাল জ্বর বা ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। এই পরিবর্তের ফলে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারা সিজনাল জ্বরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যেমন শিশু ও বৃদ্ধরা। মূলত তাদেরই হয় বেশি হয়।
লক্ষণ
শিশুদের এই ভাইরাস জ্বর সাধারণত সর্দি কাশি গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা এবং অনেক সময় পাতলা পায়খানা এবং বমিও হতে পারে। ভাইরাস জ্বর নানা রকম ভাইরাস দিয়া হতে পারে যেমন, করোনা ভাইরাস, ডেঙ্গু ভাইরাস, রাইনো ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস ইত্যাদি। প্রত্যেকটা ভাইরাস জ্বরের লক্ষণও কিন্তু এক নয়। ডেঙ্গু ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ সম্পূর্ণ আলাদা।
ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ
ঢাকায় জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। কারণ এ সময়টিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল আরও এগিয়ে এসেছে। এখন জুন মাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের সময় শুরু হয়ে যায়। ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পর এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা রক্ত খাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। এডিস মশা সাধারণত ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে। সাধারণভাবে ডেঙ্গু জ্বর ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে।
এই জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, বিশেষ করে মাথার পেছনের দিকে এবং চোখের কোটরের ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা, নিল দাঁড়ার হাড়ের ভেতরও প্রচণ্ড মাথা করে। জ্বরের সঙ্গে বমি বা বমি বমি ভাব, জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেওয়ার পর আবারও জ্বর আসতে পারে, জ্বর ৪ দিন পরে হঠাৎ করে ছেড়ে দিতে পারে এবং জ্বর ছেড়ে দেওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৯৬ ঘণ্টা খুবই ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড শিশুর জন্য, স্পেশালি মোটা বাচ্চাদের জন্য এর পরে আবার জ্বরের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতে পারে। এই জয়বিহীন সময়টাতে শরীরে লাল লাল র্যাশ উঠতে পারে এবং এই র্যাশে প্রচণ্ড চুলকানি হয় যা সাধারণত অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধে কাজ হয় না এবং এই চুলকানি তিন দিনের বেশি থাকে না।ডেঙ্গু রোগীর জ্বর চলে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই ব্লাড প্রেশার কমে গিয়ে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
একজন ডেঙ্গু রোগী যখন ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায় তখন সেই রোগীকে স্বাভাবিক বেডে চিকিৎসা সেবা দেওয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার সাপোর্ট এবং সার্বক্ষণিক স্পেশাল ট্রেইনড ডাক্তারের প্রয়োজন হয়, সেই সঙ্গে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য সারাক্ষণ চিকিৎসকের উপস্থিতি জরুরি। সাধারণ সর্দি জ্বর শিশুদের তেমন কোন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না। কিন্তু খুব ছোট শিশু এবং দুর্বল শিশুদের নানা ধরনের জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে।
সতর্কতা
সাধারণ সর্দি জ্বর হলেও জ্বর যদি তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং এর তীব্রতা বাড়তে থাকে, প্রচণ্ড কাশি এবং কাশির সঙ্গে বুকের ভেতরটা দেবে যায়, শ্বাসের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় যেমন ২ মাসের কম শিশুর শ্বাসের গতি মিনিটে ৬০ বা তার বেশি, ২ মাস থেকে ১ বছরের কম শিশুদের ৫০ অথবা তার বেশি, ১ বছর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ৪০ অথবা তার বেশি হলে কালবিলম্ব না করে বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাতে হবে। এ ছাড়া সাধারণ সর্দি জ্বরের জন্য বাসায় বিশ্রাম করতে হবে, প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ চিকিৎসকদের পরামর্শ মত সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে খাওয়াতে হবে। কুসুম গরম পানি দিয়া গা মোছানো এবং প্রচুর পরিমাণে তরল শক্তিদায়ক খাবার খাওয়াতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে বুকের দুধও খাওয়াতে হবে, কাশির জন্য কুসুম গরম লেবুর শরবত এবং বড় বাচ্চা হলে মধু দিয়া লেবুর চা খাওয়ালেই এটা সেরে যায়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো বাচ্চার রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়াতে হবে। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দরকার ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ, খেলা ধুলা করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে পানি, ভিটামিন, প্রোটিন এবং মিনারেল জাতীয় খাবার খাওয়া। আমাদের শহরের বাচ্চাদের খেলা ধুলার প্রতি কোন টান নেই, শুধু স্মার্টফোনে গেম খেলা, ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত বেশি বিধায় এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম থাকে, তাই এরা দ্রুত রোগাক্রান্ত হয়ে পরে।
লেখক: অধ্যাপক ও পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউট, শ্যামলী।
কিউএনবি/অনিমা/০২ অগাস্ট ২০২৩,/রাত ১১:৫৮