আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গত মাসের প্রথম দিকে (৭ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যের মেমফিসে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক টায়ার নিকোলসকে গ্রেফতার করা হয়। এর তিন দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। প্রায় এক মাস পর গত বুধবার (২ ফেব্রুয়ারি) তাকে সমাহিত করা হয়।
শুক্রবার (৩ ফেব্রুয়ারি) মেমফিস পুলিশ বিভাগের (এমপিডি) পক্ষ থেকে বলা হয়, টায়ার নিকোলসের গ্রেফতার ও ভয়াবহ নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, পাঁচজনকে আগেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে। সবশেষ প্রেসটন হেমফিল নামে এক কর্মকর্তাকে ‘ব্যক্তিগত আচরণ, বিশ্বস্ততা ও টেজার গান ব্যবহার সম্পর্কিত একাধিক পুলিশি নীতি লংঘনের কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। আর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদও আজকের নয়। গত মাসে টায়ার নিকোলস হত্যার পরও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবাদের মুখে প্রায় ২০ দিন পর গত শুক্রবার (২৭ জানুয়ারি) নিকোলসের নির্যাতনের হৃদয়বিদারক ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ।
নিকোলসের গ্রেফতারে জড়িত পুলিশের শরীরে থাকা ক্যামেরা ও ড্যাশবোর্ডের ক্যামেরা থেকে ওই ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে নিকোলসকে বের করার পর লাথি–ঘুষি মারছে। কয়েক মিনিট ধরে চলতে থাকে এই মারধর। পুলিশের মারধরের একপর্যায়ে তীব্র যন্ত্রণায় ‘মা’ বলে ডেকে ওঠেন নিকোলস।
ভিডিও ক্লিপ অনুসারে, পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথমে নিকোলসকে গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনে। ওই সময় নিকোলস বলছিলেন, ‘আমি কিছুই করিনি, আমি বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম’। কিন্তু তার কোনো কথা শুনেই গাড়ির বাইরে এনে মাটিতে ফেলে দেয়া হয় আর মুখে ছিটিয়ে দেয়া হয় পিপার স্প্রে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মাটিতে শুয়ে থাক।’ আর অন্য একজন বলেন, ‘চেপে ধরো।’ এ সময় নিকোলসকে বলতে দেখা যায়, ‘ঠিক আছে, আমি মাটিতে শুয়ে পড়েছি।’ পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ‘হাত ভেঙে দেয়ার আগে সেগুলো শরীরের পিছনে নাও।’এ সময় নিকোলস বলে ওঠেন, ‘আপনারা একটু বেশি করছেন, আমি কেবল বাড়িতে যেতে চাইছি।’ এর কিছুক্ষণ পর ক্যামেরা ঝাপসা হয়ে আসে ও নিকোলসকে দৌড়াতে দেখা যায়। এরপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে লক্ষ্য করে টেসার (শরীর অবশ করে দেয়ার জন্য বিশেষ বৈদ্যুতিক গুলি) চালায়। এরপর ওই পুলিশ কর্মকর্তা নিকোলসকে মারতে থাকে।
প্রথক আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, নিকোলসকে ধরে ফেলার পর ধস্তাধস্তি হয় ও পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে পেটাতে থাকে। এ সময় দুজন নিকোলসকে ধরে রাখে ও আরেকজন তাকে লাথি মারতে থাকে। আরেকজন একটি রড দিয়ে নিকোলসকে আঘাত করে। অন্যজন নিকোলসকে ঘুষি মারতে থাকে। কয়েক মিনিট পর নিকোলস নিজের গাড়ির কাছেই রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এ ঘটনার তিন দিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নিকোলস। নিকোলসের পরিবার এই ঘটনাকে ১৯৯১ সালে লস এঞ্জেলেসের গাড়িচালক রডনি কিংকে পেটানোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ভিডিও ফুটেজ সামনে আসার পরদিন শনিবার (২৮ জানুয়ারি) পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে তাদেরকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ভিডিওগুলো প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, এ ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ ও খুবই কষ্ট পেয়েছেন।
টায়ার নিকোলসের মা ও সৎবাবার সঙ্গে ফোনেও কথা বলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ওই ফোনালাপের বিষয়ে তিনি বলেন, নিকোলাসের মা রোভন ওয়েলস অবশ্যই বড় বেদনার মধ্যে রয়েছেন। ছেলের মৃত্যুর জন্য তাকে সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
টায়ার নিকোলস যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক পণ্য আদান-প্রদানের জন্য সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর একটি ফেডএক্সের একজন কর্মী ছিলেন। পুলিশের হাতে তার অকাল মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ মার্কিনীরা। তার এ হত্যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড (৪৬) নামের আরেক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাটি।
জাল নোট ব্যবহারের অভিযোগ এনে ওই বছরের ২৫ মে ফ্লয়েডকে আটক করে মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরের পুলিশ। আটকের পর হাঁটু দিয়ে সড়কে তার ঘাড় চেপে ধরেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ সময় নিশ্বাস নিতে পারছেন না বলে জানালেও ছাড়েননি তারা। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
কিউএনবি/আয়শা/০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩/রাত ৮:২৫