শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

ফাতেমা হোসেন এর ছোট গল্পঃ কড়া

ফাতেমা হোসেন,পল্লবী, ঢাকা।
  • Update Time : শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২
  • ২৩৫ Time View

কড়া
——
চৈত্রের ভর দুপুরে ভাত খেয়ে অভ্যাস মতো পানের বাটা টা নিয়ে বসেছেন বাড়ির মালকিন সত্তর উর্ত্তীন্ন জাহানারা বেগম। পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি।দু’ধারেই বড় বড় ঘর সংলগ্ন দুটো বিশাল বারান্দা। দখিনের বারান্দার সামনে বিশাল বটগাছ আর দূরে একটা স্থানীয় নদী ।

এখন আর নদী বলা যায় না খাল এর মতো সরু হয়ে গেছে। কোনো কোনো সময় নদীটা র দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখেন আর ভাবেন, এ যেন তারই জীবন চিত্র। যখন বিয়ে হয়ে এবাড়িতে আসেন তখন নদিটা প্রায় বটগাছের কাছাকাছি ই ছিলো। পানিতে ভরপুর। এ বাড়িটাও দেবর ননদ শ্বশুর শ্বাশুড়ি, আত্মীয় স্বজন পৌষ্য, চাকরবাকরে গমগম করতো। তারপর ননদ দেবরেরা বিয়ে শাদি করে যে যার জাগায় চলে গেল। শ্বশুর শ্বাশুড়ি মারা গেলেন। ছেলেমেয়েরা ও বড়ো হয়ে শহর মুখি হল। আজ তিনি একা।আজ নদীর ও জৌলুশ শেষ, তারও জৌলুশ শেষ।

বারান্দায় অবারিত বাতাস। এখানটায় বসে শুয়ে তিনি ঝিমোন আর পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করেন।

চার সন্তানের জননী তিনি। হয়েছিল সাত টা। ছোটো তে মরে মরে এ ক’টা ই বেঁচে রইলো। তারা সবাই বড়ো হয়ে গেছে বিয়ে থা’ হয়ে শহরে বিদেশে বাস করে। ঈদ পার্বণে কখনো সখনো আসে। বছর দশেক আগে কর্তা হঠাৎ করেই এক সন্ধ্যা য় খারাপ লাগছে বলতে বলতে চোখের সামনে ধড়ফড়িয়ে মরে গেল। সেই সময় কোনো ছেলে মেয়েই কাছে ছিলো না। কেয়ার টেকার বাবুল মিয়ার কাছে খবর পেয়ে দেশে যারা ছিল সবাই এল।শুধু মেজ মেয়ে ইতালি তে থাকার কারণে আসতে পারলোনা।

একমাত্র ছেলে আর বউ কাছেই শহরের বাড়িতে থাকে।কর্তা বেঁচে থাকতেই বাড়ির জায়গা কিনে পাঁচতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে একতলাটা করে দিয়ে গেছিলেন। তিনি ছিলেন আধুনিক মানষিকতার লোক। শিক্ষিত ছেলে মেয়ে তাদের বাচ্চারা ভবিষ্যতে গ্রামের বাড়িতে আসাটা যদি পছন্দ না করে।

তাছাড়া বয়স হলে নিজেদের অনেক রকম অসুখ বিসুখ হতে পারে, তার চিকিৎসা করাতে ঢাকা বা বাইরে যাবার আগে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হলেও জেলা সদরে একটা বাড়ি থাকা দরকার। বাড়ি তৈরি হলে একমাত্র বউমার পছন্দে ঘরের আধুনিক আসবাব পত্র দিয়ে বাড়ি সাজানো হলো।

কর্তার তখন কি যে আনন্দ! কি খুশি! শুধু বলতো দেখ শায়লার মা , আমরা ও এখন থেকে মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে থাকবো ওরাও আসবে সম্পর্ক টা ও খুব ভালো থাকবে। তখন থেকে ই জাহানারা বেগম বুঝে গেছিলেন বউ শ্বাশুড়ি র সম্পর্ক যাতে ভালো থাকে সেই বিবেচনা করে উনি এই ব্যাবস্থা করে দিয়ে গেলেন।

বাবা মা কে রেখে নতুন বাড়িতে চলে যেতে ছেলের অনিচ্ছা থাকা সত্বেও বাবা আর বউ এর কথা শুনে সে-ও রাজি হয়ে গেল।তবে শর্ত দিল বউ ছেলে মেয়ে কে নিয়ে ওখানে থাকলেও বাবার ব্যাবসায় হাত লাগানোর জন্য যখন প্রয়োজন হবে তখন ই সে আসবে। বউ প্রথমে রাজি না হলেও শ্বশুর এর কথা ভেবে রাজি হয়েছিল।

বেশ দু ‘চার বছর ভালোই কাটলো এরপর আস্তে আস্তে নানা অজুহাতে ছেলের আসা কমে যেতে থাকলে সোবহান সাহেব আর একা পেরে উঠছিলেন না।ভাদ্রমাসের প্রচন্ড গরমের সময় একদিন সন্ধ্যা য় ম্যানেজার কে নিয়ে মোকাম থেকে টাকা আদায় করে বাড়ি ফিরেই গিন্নিকে শরবত দিতে বল্লেন। শায়লার মা আগে থেকে ই তার পছন্দের বেলের শরবত বানিয়ে রেখেছিলেন। শরবত খেয়ে একটু বিছানায় গা এলিয়ে ফ্যান ছেড়ে দিতে বললেন।ফ্যান ছেড়ে দিয়ে যেই না উনি রাতের খাবারের যোগাড় করার জন্য নিচের ঘরে যেতে পা বাড়িয়েছেন, অমনি সোবহান সাহেব গো গো ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলে কোনো রকমে বললেন আমার “খারাপ লাগছে তুমি যেওনা।” জাহানারাবেগম দৌঁড়ে এসে স্বামী কে ধরে বসে গেলেন, তখনই সোবহান সাহেব “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” বলে তার কোলে ঢলে পড়লেন। নিমেষেই তার দুনিয়া অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে গেল।

ছেলে মেয়েরা বাপের চার দিনের কুলখানি করে দু এক দিন থেকে যার যার কাজের কথা বলে ফিরে গেল।তাকে সবাই নিয়ে যেতে চাইলেও তিনি চারমাস দশ দিন এর ইদ্দত কালের পুরো টা সময় এখানেই থাকবেন বলে সবাই কে জানিয়ে দিলেন।তার ইচ্ছার প্রতি সন্মান দেখিয়ে কেউ আর জোড়াজুড়ি করলো না।

সেই থেকে এই বিরান বাড়িতে তিনি একাই থাকেন। কাজের লোক বুড়ির মা থাকে। বুড়িও থাকে। সে গ্রামের এনজিও’র স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। ওরা মা মেয়ে আর বাবা নীচ তলার কাছারি ঘরটাতে থাকে। তার পাশে আরও দুটো ঘর আর বাথরুম নিয়ে কেয়ার টেকার বাবুল মিয়া বউ ছেলে নিয়ে থাকে বারান্দায় রাননা করে। ওদের দ্বারা বিজনেস আর বাজার ঘাট রান্না -বান্নার হেল্প পান তিনি।ছেলে মেয়েরাও মা কে নিয়ে নিসচিন্তে থাকে।যদিও তারা অনেক বার ই তাদের মাকে নিজেদের কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছিল। দু একবার তিনি গিয়েওছিলেন।

কিন্তু ওখানে কেমন বদ্ধ বদ্ধ লাগে। দম আটকে আসে ভালো লাগেনা। এ বাড়ি এই নিজ হাতে তিল তিল করে সাজানো সংসার রেখে তিনি কোথাও গিয়ে থাকতে পারেন না।ছেলে মেয়ে বউ নাতি দের বড্ড অভিযোগ অভিমান তাকে নিয়ে। তিনি ছেলে মেয়ের সংসারে কর্মহীন কতৃত্বহীন অবস্থায় থাকতে পারেন না। সেটা কেউ ই যেন বুঝে না।

এইসব পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল এমন সময় সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তার ঘুম ভেংগে যায়। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে কান পেতে শোনার চেস্টা করেন কে এলো! এই অবেলায়!

 

লেখিকাঃ ফাতেমা হোসেন নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করেন। জীবন ঘনিষ্ঠ চিত্র আঁকতে তিনি পারদর্শিনী। জীবনের খন্ডচিত্র আঁকতে তিনি এই ছোট গল্পটি তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করেছেন। আমরা সেখান থেকে সংগ্রহ করেছি।

 

 

 

 

কিউএনবি/বিপু/১৩.০৮.২০২২/ দুপুর ২.১৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit