তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে বিনিয়োগ ও ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিপুল সম্পদ তৈরি করছে। এর প্রভাবে ২০২৫ সালে বিশ্বের বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতির সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ৩ হাজার ৭৯৫ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণও সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উঠেছে। সম্পদবিষয়ক গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আলট্রাটা-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে বিলিয়নিয়ারদের মোট ১৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। একই সময়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ‘সুপারবিলিয়নিয়ার’-এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ জনে।
এআই খাতে বিনিয়োগ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবানদের মধ্যে রয়েছেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ, টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মতো বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা। তাদের সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও এআই-ভিত্তিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে বিপুল সম্পদের মালিকদের আগ্রহ শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নেই। বিলাসবহুল বাড়ি ও ব্যক্তিগত বিমানের পাশাপাশি পেশাদার ক্রীড়া দল এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডও তাদের সম্পদ ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
আলট্রাটার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলিয়নিয়ারদের কাছে ক্রীড়া দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম জনপ্রিয় আগ্রহ। বিনোদন ও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ক্রীড়া দলের মালিকানা তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ায় এবং ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
জেফ বেজোস এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রায় ২৮২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক এই ধনী ব্যক্তি চলতি সপ্তাহের শুরুতে তার কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লিভারপুল এফসিতে প্রায় ৪০ শতাংশ অংশীদারত্ব কিনেছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্রকৃতি সংরক্ষণে তার ‘বেজোস আর্থ ফান্ড’-এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ দান করা হয়েছে। ক্রীড়া ও জনকল্যাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা অন্য ধনীদের মধ্যে রয়েছেন মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী স্টিভ বলমার এবং ব্যবসায়ী রবার্ট ক্রাফট।
আলট্রাটার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২০১ জন বিলিয়নিয়ার কোনো না কোনো ক্রীড়া দল বা ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানায় অংশীদার। এই সংখ্যা বিশ্বের মোট বিলিয়নিয়ারের ৫ শতাংশের কিছু বেশি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, জনপ্রিয় কোনো ক্রীড়া দলের মালিকানা শুধু সম্পদের প্রদর্শন নয়; এটি প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি করে।
গত এক দশকে বিলিয়নিয়ারদের ‘প্যাশন অ্যাসেট’ হিসেবে পরিচিত সুপারইয়ট, বিলাসবহুল ঘড়ি, শিল্পকর্ম ও ক্রীড়া দলের মতো সম্পদের মূল্য গড়ে প্রতিবছর ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে।
এসব সম্পদ কেনার পেছনে শুধু আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য কাজ করছে না। অতিধনীরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও সম্পদ প্রদর্শন, পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং দুর্লভ ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেও এসব বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে ক্রীড়া দল এখন অনেক বিলিয়নিয়ারের কাছে ‘ট্রফি অ্যাসেট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএল ও এনবিএর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের প্রিমিয়ার লিগও ধনীদের ক্রীড়া বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে। তেল ও গ্যাস ব্যবসায়ী জেরি জোন্স ১৯৮৯ সালে এনএফএলের ডালাস কাউবয়েজ কেনেন। ১৯৯৪ সালে রবার্ট ক্রাফট নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস এবং স্টিভ বলমার লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লিপার্সের মালিকানায় যুক্ত হন। পরে ২০০৫ সালে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ম্যালকম গ্লেজার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এফসিতে বড় বিনিয়োগ করেন। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন জেফ বেজোস।
ক্রীড়া দল কেনার পাশাপাশি এর পেছনে বড় ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও রয়েছে। ক্রীড়া সম্প্রচারস্বত্ব, স্ট্রিমিং, বেটিং সেবা এবং স্পনসরশিপ থেকে আয় বাড়তে থাকায় বিভিন্ন ক্রীড়া লিগ এখন বড় বিনিয়োগের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড বা ফিলানথ্রপিও বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ ব্যবহারের একটি বড় মাধ্যম। এনবিএ দলের মালিকানার পাশাপাশি স্টিভ বলমার ও তার স্ত্রী কনি গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র শিশু ও পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দান করেছেন।
নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটও স্বাস্থ্যসেবা, কারাগার সংস্কার এবং ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন উদ্যোগে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। এদিকে, ক্লিভল্যান্ড ক্যাভালিয়ার্সের মালিক ড্যান গিলবার্ট ডেট্রয়েট শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার উন্নয়নে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে নিম্নআয়ের বাড়ির মালিকদের সম্পত্তি করসংক্রান্ত ঋণ কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এআই-নির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন নতুন বিলিয়নিয়ার ও বিপুল সম্পদের জন্ম দিচ্ছে, তেমনি বিশ্বের অতি-ধনীদের বিনিয়োগের ধরনও বদলে দিচ্ছে। প্রযুক্তি ও আর্থিক সম্পদের পাশাপাশি ক্রীড়া দল, বিলাসবহুল সম্পদ এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ তাদের সম্পদ ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
কিউএনবি/আয়শা/০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:০৪