শ্যামল মিত্রের সন্ধানে —
কোলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে নৈহাটী যেতে ১ ঘন্টা ১৬ মিনিট লাগে। দূরত্ব ৪৮.৫ কিলোমিটার। মাঝে বরাহনগর আর ব্যারাকপুর গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্টেশন মেলবন্ধন রচনা করে আছে শিয়ালদহ আর নৈহাটির মাঝে।
আমি ছুটছি নৈহাটী এবং চুঁচড়াতে। উদ্যেশ্য শ্যামল মিত্রের চারণভূমির অনুসন্ধান।
খুব ছোটবেলায় রাত সাড়ে ১০টায় রেডিওতে অনুরোধের আসরের প্রিয় সকল গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। বলতে গেলে প্রতিদিনই একটি গান শোনার জন্যে অনুরোধের আসরে চিঠি লিখতে শ্রোতারা। চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা, ভালোবাসো যদি কাছে এসোনা। শ্যামল মিত্রের এই সাড়াজাগানো গানটির সাথে শৈশবের সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত এক আনোখা সম্পর্ক তৈরী করে রেখেছে।
শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে যৌবন ও জীবনের পর্যন্ত পড়ন্ত বেলা পর্যন্ত শ্যামল মিত্র জড়িয়ে আছে আমার গান শোনার ভুবনে।
শ্যামল মিত্র জন্মগ্রহণ করেন ১৪ জানুয়ারী ১৯২৯ সালে। তিনি প্রয়াত হন ১৫ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে। ছিলেন ভারতীয় নেপথ্য গায়ক , সঙ্গীত পরিচালক এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক। তিনি হিন্দি এবং বাংলা উভয় চলচ্চিত্রে ব্যাপকভাবে কাজ করেছেন এবং হেমন্ত মুখার্জি , কিশোর কুমার , মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মান্না দে এবং অন্যান্য বাঙালি গায়কদের পাশাপাশি বাংলা সঙ্গীত শিল্পের স্বর্ণযুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন ।
শ্যামল মিত্রের ব্যারিটোন কণ্ঠ তার অভিব্যক্তিপূর্ণ গুণ এবং বিস্তৃত আবেগ পরিসরের জন্য পরিচিত ছিল। বিপুল সংখ্যক বাংলা আধুনিক গান রেকর্ড করার পাশাপাশি তিনি একশোরও বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে অবদান রেখেছেন এবং পঞ্চাশটিরও বেশি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত রচনা করেছেন। তিনি হিন্দি, অসমীয়া এবং ওড়িয়া সহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষার গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন ।
শ্যামল মিত্র ভারতের কলকাতার নিকটবর্তী শহর নৈহাটিতে একটি বাঙালি কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পৈতৃক গ্রাম ছিল শেখালার নিকটবর্তী পাটুল। তাঁর বাবা সাধন কুমার মিত্র নৈহাটির একজন সুপরিচিত ডাক্তার ছিলেন এবং তিনি চাইতেন তাঁর ছেলেও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাক্তার হোক।
কিন্তু শ্যামল মিত্র সঙ্গীতের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন এবং তাঁর মা ও স্থানীয় গায়ক মৃণাল কান্তি ঘোষের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তাঁদের পারিবারিক বাড়িটি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)-এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মিলনস্থল ছিল, যার ফলে তরুণ মিত্র সলিল চৌধুরীর সংস্পর্শে আসেন । শ্যামল মিত্র এবং তাঁর ছোট বোন রেবা প্রায়শই আইপিটিএ-র কার্যক্রমের সমর্থনে রাস্তায় “ও আলোর পথযাত্রী” গানটি পরিবেশন করতেন।
শ্যামল মিত্র হুগলি মহসিন কলেজে তাঁর স্নাতক পড়াশোনা করেন , যা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল । সেখানে তিনি আধুনিক বাংলা সঙ্গীতের এক প্রখ্যাত প্রবক্তা সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাবে আসেন। যিনি তাঁকে সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আগ্রহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। পরে, কলকাতায় চলে আসার পর সুধীরলাল চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, যা তাঁর কর্মজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে।
শুরুতে মিত্রকে অনেক সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হলেও , সুপ্রীতি ঘোষ এবং প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি ‘সুনন্দার বিয়ে’ (১৯৪৯) ছবিতে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি প্রথম সুযোগ পান । প্রায় একই সময়ে, তিনি সুধীরলাল চক্রবর্তীর নির্দেশনায় ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ লেবেলের অধীনে তাঁর প্রথম আধুনিক গান রেকর্ড করেন। ১৯৫২ সালে চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর, মিত্র ‘স্মৃতি তুমি বেদোনার’ গানটি রেকর্ড করেন, যা তাঁর কর্মজীবনে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দেয়। এরপর তিনি বাংলার অন্যতম প্রধান গায়ক ও সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
শ্যামল মিত্রের বাবা চেয়েছিলেন ছেলে যেন তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার হাল ধরে। বন্ধুরা চাইতো, ফুটবল খেলার দুর্দান্ত গোলকিপার শ্যামল মিত্র যেন গোল পোস্ট আগলে রাখে। কিন্তু শ্যামল মিত্র বনে গেলেন এক দুর্দান্ত শিল্পী।
এই দুর্দান্ত কণ্ঠশিল্পীকে নিয়ে জানা অজানা কথা গুলো তুলে ধরব ধারাবাহিকভাবে।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
কিউএনবি/অনিমা/২১ অগাস্ট ২০২৬/সন্ধ্যা ৭.৩০