আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের তউনসা শহরের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি উঠে এসেছে। বিবিসির একটি বিশেষ অনুসন্ধান ও গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা গেছে, হাসপাতালটিতে একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মৃত মোহাম্মদ আমিনের বোন আসমার মতো আরও অনেক শিশুই আজ এই মরণব্যাধির শিকার, যাদের বাবা-মায়ের শরীরে এইচআইভির কোনো অস্তিত্ব নেই।
মাত্র আট বছর বয়সে মারা যাওয়া মোহাম্মদ আমিনের মা সুঘরা জানিয়েছেন, তার ছেলের জ্বরের তীব্রতা এতটাই ছিল যে সে বৃষ্টির মধ্যে শুয়ে থাকতে চাইত। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে ছটফট করত যেন তাকে ফুটন্ত তেলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ছোট ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ১০ বছর বয়সী আসমা জানায়, ভাইয়ের মৃত্যুর কিছুদিন পরই তার নিজের শরীরও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসে। পরিবারটির দাবি, তউনসার টিএইচকিউ হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসার সময় দূষিত সূঁচ ব্যবহারের কারণেই তাদের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে।
তউনসা শহরে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে অন্তত ৩৩১ জন শিশুর এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় একজন বেসরকারি চিকিৎসক গুল কায়সারানি প্রথম এই অস্বাভাবিক প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তিনি যখন দেখলেন যে তার ক্লিনিকে আসা অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু কোনো না কোনো সময় ওই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, তখনই তিনি কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন। তার মতে, অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেছেন যে চোখের সামনে সিরিঞ্জ পুনঃব্যবহার করতে দেখে প্রতিবাদ করলেও নার্সরা তা গায়ে মাখেননি।
বিবিসি আই-র সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৯৭ জনের পরিবারের পরীক্ষা করে দেখা গেছে মাত্র চারজন মায়ের এইচআইভি ছিল। এর মানে দাঁড়ায় যে এটি মায়ের শরীর থেকে গর্ভস্থ শিশুর কাছে ছড়ায়নি বরং হাসপাতালের অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতিই এর মূল কারণ। পাঞ্জাব সরকার শুরুতে এই প্রাদুর্ভাবের কথা স্বীকার করে হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্টকে বরখাস্ত করলেও কয়েক মাস পরেই তাকে অন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখন বারবার দাবি করছিল, তারা সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে, ঠিক তখনই বিবিসির গোপন ক্যামেরা ৩২ ঘণ্টার ফুটেজে তুলে আনে এক ভিন্ন চিত্র। ভিডিওতে অন্তত ১০ বার দেখা গেছে যে একটি বড় ওষুধের শিশি থেকে একই সিরিঞ্জ দিয়ে বারবার ওষুধ তোলা হচ্ছে এবং সেই ওষুধ বিভিন্ন শিশুর শরীরে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সিরিঞ্জ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে সরাসরি রক্তপ্রবাহে ওষুধ পৌঁছানোর সময় জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকদের বারবার সতর্ক করা হলেও সেখানে তা মানা হয়নি।
ফুটেজে আরও দেখা গেছে, একজন ডাক্তারসহ হাসপাতালের অনেক কর্মী কোনো ধরনের জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়াই রোগীদের ইনজেকশন দিচ্ছেন। এমনকি একজন নার্সকে খালি হাতেই নোংরা মেডিকেল বর্জ্যের বাক্সে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখা গেছে। সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরিঞ্জের সূঁচ পরিবর্তন করলেও যদি এর মূল অংশ পুনরায় ব্যবহার করা হয়, তবে আগের রোগীর রক্তে থাকা ভাইরাস খুব সহজেই পরের রোগীর শরীরে ঢুকে যেতে পারে।
তবে হাসপাতালের বর্তমান প্রধান ডক্টর কাসিম বুজদার এই চাঞ্চল্যকর ফুটেজ দেখেও তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার দাবি, এই ভিডিওগুলো হয়তো সাজানো অথবা তার দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়কার। তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে তার হাসপাতাল শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং স্থানীয় জনগণের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। যদিও সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এবং বিবিসির সংগৃহীত প্রমাণ এই দাবির সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে পাকিস্তানে ইনজেকশনের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি সাংস্কৃতিক ঝোঁক রয়েছে, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো অসুখেও রোগীরা ইনজেকশন নিতে পছন্দ করেন এবং চিকিৎসকরাও তা দিয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে ওষুধের তীব্র সংকট এবং মাসিক কোটা ব্যবস্থা বজায় রাখতে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়ই সরঞ্জামের সাশ্রয় করতে গিয়ে নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করেন না।
তউনসার এই ঘটনার পাশাপাশি করাচির কুলসুম বাই ভ্যালিকা হাসপাতালেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে দুই বছর বয়সী মিকাসার মতো ৮৪টি শিশু এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহারের ফলেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় খুব সামান্যই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে একের পর এক জনপদ এখন এই ঝুঁকির মুখে।
আক্রান্ত আসমার মতো শিশুরা এখন শুধু শারীরিক অসুস্থতাই নয়, বরং সমাজের তীব্র অবজ্ঞার শিকার হচ্ছে। পাড়ার অন্য শিশুদের সাথে তার খেলাধুলা করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সে প্রায়ই তার মাকে জিজ্ঞাসা করে তার অপরাধ কী ছিল। ছোট্ট আসমা বড় হয়ে এখন ডাক্তার হতে চায়, যাতে তার মতো আর কোনো শিশুকে যেন ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। তার এই স্বপ্ন আজ পাকিস্তানের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
কিউএনবি/অনিমা/১৪ এপ্রিল ২০২৬,/বিকাল ৫:৪৬