ডেস্ক নিউজ : আরবি মোরাকাবা শব্দের অর্থ নজরে রাখা, পর্যবেক্ষণ করা, ধ্যান করা। এর প্রতিশব্দ হলো তাফাক্কুর, অর্থ চিন্তা করা, গভীরভাবে চিন্তা করা। ইংরেজিতে মোরাকাবাকে গবফরঃধঃরড়হ বলে। সব নবী-রসুল মোরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইসলামের আত্মিক অনুশীলনের মাধ্যম হচ্ছে মোরাকাবা। হজরত রসুল (সা.) দীর্ঘ ১৫ বছর হেরা গুহায় মোরাকাবা বা ধ্যান করে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। মোরাকাবারত অবস্থায় তাঁর কাছে পবিত্র কোরআনে সুরা আল আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। মোরাকাবার মাধ্যমেই রসুল (সা.) আল্লাহর পরিচয় লাভ করেন। রসুল (সা.) বলেন, ‘একবার আমি দীর্ঘ এক মাস হেরা গুহায় অবস্থান করলাম। অবস্থান শেষে গুহা থেকে বের হয়ে আমি খোলা ময়দানে চলছিলাম। পথিমধ্যে আমাকে আহ্বান করা হলো। আমি একে একে সামনে ও পেছনে, ডানে ও বামে তাকাতে লাগলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। অতঃপর আমাকে পুনরায় আহ্বান করা হলো। এবারও আমি কাউকে দেখলাম না। পুনরায় আহ্বান করা হলে, আমি মাথা তুলে দেখলাম- আমার মহান মালিক ঊর্ধ্বাকাশে আরশের ওপর অবস্থান করে আমাকে ডাকছেন। আমার শরীরে ভীষণ কম্পন শুরু হলো। আমি খাদিজা (রা.)-এর নিকট পৌঁছালাম এবং বললাম, আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করো। অতঃপর আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করা হলো। তারপর আমার ওপর পানি ছিটানো হলো। এ সময় আল্লাহ নাজিল করেন ‘হে কম্বলাবৃত রসুল! উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’ (তাফসিরে কুরতুবি-২১ নম্বর খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫)।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মোরাকাবার ফজিলত : আল্লাহ বলেন, ‘(তাঁরাই তত্ত্বজ্ঞানী) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর জিকির করে এবং আসমান জমিন সৃষ্টির বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।’ (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯১) মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে রসুল (সা.) বর্ণিত বহু হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গভীরভাবে চিন্তা করা বা মোরাকাবার সমতুল্য কোনো ইবাদত নেই’ (তাফসিরে মাজহারি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০)। তিনি আরও বলেন, ‘রাত ও দিনের পরিবর্তনকারী আল্লাহকে নিয়ে এক ঘণ্টা মোরাকাবা করা ৮০ বছরের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’ (তাফসিরে মাজহারি, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১০)। মোরাকাবার মাধ্যমে বান্দার অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি তৈরি হয়। এতে ইবাদতের একাগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। রসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করার পদ্ধতি ৪টি। ১। গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর মোরাকাবা করা, ২। কল্যাণজনক কাজ করা, ৩। কিয়ামতের ব্যাপারে চিন্তা ও গবেষণা করা এবং ৪। আল্লাহর সমীপে মোনাজাত করা। (কালিমাতুর রাসুলিল আজম (সা.), পৃষ্ঠা ৯৪)। মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ওই আয়াতগুলো সম্পর্কে, যে আয়াতগুলো তাঁর কাছে অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহর বাণী- ‘এরূপ লোকেরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে, সেখানে তাদের দেওয়া হবে অফুরন্ত রিজিক।’ হজরত আলী (রা.) জবাবে বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহর ফরমান, ‘আমার সম্মান প্রদর্শন হয়েছে অথবা আমার বন্ধুত্ব অবধারিত হয়েছে তাদের জন্য, যারা আমার মোরাকাবা করেছে, আমার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি মহব্বত রেখেছে, কিয়ামত দিবসে তাদের চেহারা নুরানি হয়ে যাবে, তারা নুরের মিম্বরে অবস্থান করবে। তাদের দেহে থাকবে সবুজ পোশাক। আরজ করা হলো, ইয়া রসুল (সা.) তারা কারা? তিনি বলেন, তারা নবীও নন, শহীদও নন, বরং তারা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ওপর ভালোবাসা স্থাপন করেছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন স্বীয় রহমতে আমাদের তাদের দলভুক্ত করে দেন (মুসনাদে ইমাম আলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩ ও ২২৪)। হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) তাঁর ‘গুনিয়াতুত তালেবিন’ কিতাবে উল্লেখ করেন- ‘মোরাকাবা দ্বারা মুজাহাদার পরিপূর্ণতা সাধিত হয়। ফেরেশতা জিবরাইল হুজুরে পাক (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করেন যে, ইহসান কী? হুজুরে পাক (সা.) জবাবে বলেন, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহ দেখছেন। আর যদি তোমার অবস্থা তেমনটা না হয়, তবে মনে করবে যে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে দেখছেন। মোরাকাবা এটিই, বান্দা ইয়াকিন রাখবে যে, আল্লাহ তার সবকিছুরই খবর রাখেন। সদা-সর্বদা বান্দার মনে এই কথাটা জাগ্রত থাকার নামই মোরাকাবা। বান্দার জন্য যত রকম ভালো এবং কল্যাণকর বস্তু রয়েছে, সবকিছুর মূল হলো মোরাকাবা। সালেকের গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য মোরাকাবা হলো প্রধান অবলম্বন।’ (গুনিয়াতুত তালেবিন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৬ ও ২৫৭)। প্রখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক ড. কুদরত এ খোদা বলেন, ‘যে ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর পরিচয় জানা যায়, তাদের নির্দেশমতো চলা যায় ও সৃষ্টির তত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায়, তাকেই মোরাকাবা বলে।’
লেখক : গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা
কিউএনবি/অনিমা/২৬ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৬:২২