আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চিরবৈরী প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান নিয়ে ভারতের আচরণ যেন একঘেয়ে ছকে বাঁধা। বিষয়টা এমন- কাশ্মীরে কোনো হামলা হলেই ভারত এর দায় চাপায় পাকিস্তানের ওপর। তারপরই শুরু হয় ভারতীয় গণমাধ্যমে— তা মূলধারার হোক বা সামাজিক মাধ্যম— যুদ্ধের ঢাক পেটানো।
পাকিস্তানকে গালাগালি দিতে গিয়ে কেউ কেউ দেশটিকে ‘ভেঙে’ ফেলার কথাও বলে ফেলেন। আর এ ক্ষেত্রে ডান-বাম বা মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া বিশ্লেষকদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁও হামলার পর আবার সেই একই দৃশ্যপট। ভারত আবার পাকিস্তানকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার কথা বলছে। এমনকি যারা কিছুটা সংযত কণ্ঠে কথা বলছেন, তারাও ভাবছেন—কিভাবে পাকিস্তানকে শাস্তি দেওয়া যায়, যেন সেটা পারমাণবিক যুদ্ধ পর্যন্ত না গড়ায়।
তবে কাশ্মীরে ভারতের দখলদারিত্ব নিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ কার্যত নেই বললেই চলে। কেউ কেউ ‘সীমিত হামলা’ থেকে শুরু করে ‘চূড়ান্ত সমাধান’-এর মতো ভয়ংকর কল্পনাও হাজির করছেন—যার মধ্যে নিহিত আছে গণহত্যার সম্ভাবনাও। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন বাস্তবতা ও দায়িত্ববোধের আলোকে আলোচনা করা। কারণ এই যুদ্ধোন্মাদনা শুধু ভারত-পাকিস্তান নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
এই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে:
(ক) যুদ্ধ মানে কী—সেটা হোক পূর্ণমাত্রায় বা সীমিত পর্যায়ে;
(খ) কেন ভারত ও পাকিস্তান বারবার এই সংঘাতের চক্রে পড়ে;
আর অবধারিতভাবেই বিষয়টি এসে ঠেকে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অস্বীকৃতি ও দমননীতি পর্যন্ত।
এটি ভবিষ্যদ্বাণী নয় যে, ভারত কী করতে পারে বা কী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করবে। মূল বক্তব্য হলো: সীমিত যুদ্ধ সীমিত পর্যায়ে থাকবে—এই নিশ্চয়তা নেই। আর যুদ্ধ প্রায়ই ভুল হিসেবের ফলেই শুরু হয়।
ক্লজউইৎসের ‘উদ্দেশ্য বনাম লক্ষ্য’
প্রুশিয়ান সেনানায়ক ও যুদ্ধতাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজউইৎস বলেন, যুদ্ধ মানে কেবল যুদ্ধ নয়— এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উপায়। তিনি এক্ষেত্রে দুটি শব্দ ব্যবহার করেন: Zweck (উদ্দেশ্য) ও Ziel (লক্ষ্য)।
যুদ্ধের প্রতিটি যুদ্ধাভিযান বা জয় তখনই অর্থপূর্ণ, যদি তা সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
ধরা যাক, ভারত পাকিস্তানকে ‘শাস্তি’ দিতে চায়। যদি দেশটি তা পারে এবং পাকিস্তান পাল্টা জবাব না দেয়, তাহলে কি ভারত বিজয়ী? উত্তর হবে— যদি সেই শাস্তি ভারতকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল এনে দেয়, তবে হ্যাঁ। আর না হলে, উত্তর হবে— না।
এক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী? শুধু ঘরোয়া জনমত গঠন বা নির্বাচন নয়— বরং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’ গড়ে তোলা। যাতে ভবিষ্যতে পাকিস্তান ভারতের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছুই না করে। কিন্তু পাকিস্তান যদি আবার একই কাজ করে, তাহলে আগের ‘শাস্তি’ দিয়ে ভারত কী অর্জন করল?
পারমাণবিক ছায়ায় যুদ্ধের হিসাব
মূলত পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধের কৌশলকে আরও জটিল করে তোলে। পাকিস্তান তার পারমাণবিক কৌশলে ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা বজায় রাখে। যাতে ভারত নির্ভুলভাবে বুঝতে না পারে যে, কোন পর্যায়ে গিয়ে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। এর ফলে, আক্রমণকারী পক্ষকে প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হয়।
নির্বাচিত যুদ্ধ বা ‘সীমিত যুদ্ধ’ ধারণাটিও এই ঝুঁকির কারণে কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে গোপনে চালানো একটি যুদ্ধগেম Proud Prophet-এ দেখা গেছে, সীমিত যুদ্ধও পরিণত হতে পারে সম্পূর্ণ পারমাণবিক সংঘাতে, যার ফলাফল হয় কোটি কোটি প্রাণহানি।
ভারতের ‘সীমিত হামলার’ ফিকশন
ভারত ধারণা করে— সীমিত সামরিক অভিযান চালালে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপ ও সামরিক দুর্বলতার কারণে প্রতিশোধ নেবে না।
তবে তার এই ধারণার ভিত্তি হচ্ছে একটি জিনিস— প্রথম দফায় ভারতীয় হামলা সফল হবে। যদি পাকিস্তান প্রথমেই তা ব্যর্থ করে দেয় বা পাল্টা জবাব দিতে সক্ষম হয়। তাহলে পুরো ‘সীমিত হামলা’ তত্ত্ব ভেঙে পড়বে।
২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পরের পরিস্থিতিতে ভারত তা দেখেছে — পাকিস্তান পাল্টা জবাব দিয়েছে। দুই পক্ষের যুদ্ধবিমান আকাশে লড়েছে। ভারতের ধারণা অনুযায়ী, পাকিস্তান ‘চুপ করে থাকবে’— কিন্তু সেটি হয়নি।
কাশ্মীর ও উপমহাদেশীয় ফাঁদ
জার্মান ধর্মতাত্ত্বিক ডায়েটরিশ বনহোফার বলেছিলেন, ‘ভুল ট্রেনে উঠে পড়লে, করিডোরে উল্টো দৌড়ালেও লাভ হয় না’। ভারত কাশ্মীর নিয়ে সেই অবস্থাতেই আছে।
কাশ্মীরিরা ভারতের সঙ্গে থাকতে চায় না। পাকিস্তানও কাশ্মীর ইস্যু ছাড়তে রাজি নয়। ভারত কাশ্মীরে দমননীতি চালায়, আর পাকিস্তানকে দায়ী করে।
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের কৌশল হয়ে উঠেছে—(ক) পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মহলে বিচ্ছিন্ন করা এবং (খ) পাকিস্তানকে ‘চূড়ান্তভাবে পরাজিত’ করার চেষ্টা। আর এর পেছনে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দাবি এবং ঘরোয়া জনতুষ্টি।
এদিকে পাকিস্তানের কাশ্মীর নীতিতেও ভুল আছে। কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ ভারত পেয়েছে মূলত পাকিস্তানের অপরিপক্ব নীতির কারণেই।
শেষ কথা
ভারতের যুদ্ধচিন্তা, বিশেষ করে সীমিত হামলার কল্পনা পারমাণবিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, যুদ্ধ একবার শুরু হলে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। তাই দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে সামান্য ভুলও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা— কাশ্মীর প্রশ্নে সমাধান না হলে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা চলতেই থাকবে।
(ডন-এ প্রকাশিত পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক ইজাজ হায়দারের লেখা অবলম্বনে)
কিউএনবি/আয়শা/০৪ মে ২০২৫, /রাত ৮:৩০