বাংলায় বেনজীর শব্দটির অর্থ হলো নজিরবিহীন, দৃষ্টান্তবিহীন, তুলনাহীন, অনুপম, অতুলনীয়, লাজবাব বা যার কোনো তুলনা হয় না। বেনজীর শব্দটি ফার্সি ও আরবি শব্দের যৌথ এক প্রায়োগিক রূপ। ফারসি থেকে ‘বে’ নাই/না-বোধক এবং আরবি থেকে ‘নজীর’ বা দৃষ্টান্ত শব্দ দুটির সমন্বয়ে বেনজীর শব্দটি সৃষ্ট। শব্দটির ব্যবহারিক রূপ ও সমার্থক শব্দ: তুলনাহীন: যার সমকক্ষ আর কেউ বা কিছু নেই। অতুলনীয়: অন্য কিছুর সাথে মেলানো যায় না এমন।
আজ টক অব দ্য কান্ট্রি বেনজীর। সারাদেশে তাকে নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তার মর্মার্থ এই, প্রকৃতি অস্বাভাবিকতা গ্রহণ করেনা। প্রকৃতি অন্যায়, অত্যাচার, অস্বাভাবিকতাকে প্রশ্রয় দেয়না। যার নজীর বা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
একসময় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ডিএমপি কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং আইজিপি-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেমন ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি বিভিন্ন বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমালোচনারও কেন্দ্রে ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগ ও এর প্রেক্ষিতে দুবাইয়ে গ্রেফতারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই সাবেক পুলিশপ্রধান।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর আদালত একাধিক সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, শত শত বিঘা জমি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এবং সঞ্চয়পত্র।
১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে।
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় র্যাবের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের ৩০তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান তিনি।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো পুলিশ প্রধান এতটা দৃশ্যমান, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ছিলেন না। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বর কর্মসূচি উচ্ছেদ অভিযানে ঢাকার পুলিশ কমিশনার হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। পরে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে সড়ক অবরুদ্ধ করার ঘটনা তখন ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সে সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও বারবার উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বেনজীর আহমেদ। র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা প্রথম বাংলাদেশি আইজিপি ছিলেন তিনি।
২০২১ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে ঢাকার বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন বেনজীর আহমেদ। তিনি ওই বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতি।
দুদকের অনুসন্ধান ও আদালতের বিভিন্ন আদেশের পর এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটাই প্রশ্ন—দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থপাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীরের অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতি নিয়ে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ সর্বপ্রথম গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামের ওই সংবাদে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি ফাঁস করা হয়েছিল।
ওই সংবাদে উঠে আসে বেনজীরের প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তথ্য। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক এই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। সে সময় অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে অন্তত ছয়টি কম্পানির খোঁজ পায় সংবাদমাধ্যম।
‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত আরেক সংবাদে বেরিয়ে আসে ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নামের একটি রিসোর্টের মালিকানায় যুক্ত হন বেনজীর।
ডিএমপি কমিশনার হিসেবে প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে রিসোর্টের ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নেন তিনি।বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা সেসময় জানান, ভাওয়াল রিসোর্টের ভেতরে ও প্রবেশমুখে বন বিভাগের ৬.৭৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ বনের বিশাল এই জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ভাওয়াল রিসোর্ট। বন বিভাগের তথ্য মতে, ভাওয়াল রিসোর্টের দখল করা জমির মধ্যে রয়েছে ৪ নম্বর বরইপাড়া মৌজার ৩, ২৭৯ ও ২৭১ নম্বর সিএস দাগে ১১ বিঘা। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, বেনজীরের ক্ষমতার দাপটে সবাই ছিলেন নির্বিকার, নিরুপায়।
‘২৪০ বিঘা জমির মালিক বেনজীরের স্ত্রী’ শিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার নামে ২৪০ বিঘা জমি। রাতারাতি গৃহিণী থেকে ব্যবসায়ী বনে যাওয়া জীশান মীর্জার সম্পদের পরিমাণ স্বামীর চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি।
‘চাকরির শেষ তিন বছরেই কেনেন ৪৬৬ বিঘা জমি’ শিরোনামে আরো এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে বেনজীর আহমেদ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীনের পর পরিবারের সদস্যদের নামে কেনা হয় ৪৬৬ বিঘা জমি। ১৯টি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হয়ে যায় পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী পরিবার।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তার নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
দুবাইয়ে আজ বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার হয়েছেন। তাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে মর্মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। তার গ্রেফতার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে।
টক অব দ্য কান্ট্রির মূল প্রতিপাদ্য এটাই -নজিরবিহীন এক দূর্নীতির বরপুত্র বেনজির আহমেদ এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চায় দেশবাসী।
পাদটীকাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে বেনজীর আহমেদ ও আমি একই হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের একজন ছাত্র হিসাবে এমন একজন ধিকৃত অগ্রজের দূর্নীতি নিয়ে লিখতে হবে তা আমার কাম্য ছিলনা। কিন্তু ধর্মের ঢোল যখন বেজে উঠে তখন তাকে আর থামানো যায়না।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
কিউএনবি/বিপুল/১৪.০৬.২০২৬/রাত ১০.৫০