স্পোর্টস ডেস্ক : গতকাল সোমবার (২৫ নভেম্বর) পার্থ টেস্টের চতুর্থ দিনে ২৩৮ রান অলআউট হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে ২৯৫ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছে জাসপ্রীত বুমরাহর নেতৃত্বে খেলতে নামা ভারত। এই জয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান ফিরে পেয়েছে তারা।
তবে শীর্ষস্থান ফিরে পেলেও লর্ডসের ফাইনালে এখনও জায়গা নিশ্চিত করতে পারেনি ভারত। এখন পর্যন্ত পাঁচটি দল ফাইনালে জায়গা করে নেয়ার লড়াইয়ে টিকে আছে। দলগুলো হলো- ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। দেখে নেয়া যাক ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে কেমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে দলগুলো।
ভারত (বাকি- ৪ টেস্ট): পার্থ টেস্টে বিশাল জয় সত্বেও ফাইনালে ভারতের জায়গা এখনও নিশ্চিত নয়। গত দুই ফাইনালেই খেলা ভারত টানা তৃতীয় ফাইনালে ওঠার পথে দীর্ঘ সময় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হওয়ায় লড়াই উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত ১৫ টেস্ট খেলে ৯টিতে জয় ও একটিতে ড্র করা ভারত ৬১.১১ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে। তাদের হাতে এখনও বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির ৪ ম্যাচ বাকি। সমীকরণ বলছে, ভারত যদি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজটি ৪-০ ব্যবধানে জিততে পারে তাহলে ফাইনালে উঠতে আর কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না তাদের।
৪ ম্যাচে জয় ও ১টি ড্র নিয়ে শেষ করতে পারলে ভারতের পয়েন্ট শতাংশ দাঁড়াবে ৬৫.২৯, যা তাদের নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ (৬৪.২৯) পয়েন্ট শতাংশের চেয়ে ওপরে রাখবে, যদি কিউইরা ইংল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে ঘরের মাঠে হারাতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পয়েন্টধারী হিসেবে ফাইনালে উঠবে। ভারতের চেয়ে বেশি পয়েন্ট শতাংশ অর্জন সম্ভব শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে, যদি তারা ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ দুটিতে হারাতে পারে।
পয়েন্ট টেবিল। ছবি: ক্রিকইনফো
এই হিসেব করা হয়েছে দলগুলোর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পয়েন্ট শতাংশ বিবেচনায় রেখে। তবে এর চেয়ে কম পয়েন্ট শতাংশ নিয়েও ফাইনাল খেলতে পারে ভারত। ভারত যদি অস্ট্রেলিয়ার কাছে চলমান সিরিজ ৩-২ ব্যবধানে হারে এবং নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ব্যবধানে ড্র করে, দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের বাদবাকি দুই সিরিজেই যদি ১-১ ব্যবধানে ড্র করে এবং অস্ট্রেলিয়া যদি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ সিরিজে 0-0 ব্যবধানে ড্র করে, তবে অস্ট্রেলিয়া ৫৮.৭৭ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে শেষ করবে। এ ক্ষেত্রে ভারত ৫৩.৫১ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় হবে। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকা ৫২.৭৮, নিউজিল্যান্ড ৫২.৩৮ এবং শ্রীলঙ্কা ৫১.২৮ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে ভারতের পেছনে থাকবে।
অস্ট্রেলিয়া (বাকি- ৬ টেস্ট): ভারতের কাছে প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে হেরে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ স্থান হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। একই সঙ্গে ফাইনালে ওঠার পথও তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া ৫৭.৬৯ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে দুইয়ে আছে। কারও ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ফাইনালে জায়গা করে নিতে অস্ট্রেলিয়াকে এখন হাতে থাকা বাকি ৬ টেস্টের পাঁচটিই জিততে হবে। সে ক্ষেত্রে তারা নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ (৬৪.২৯) পয়েন্ট শতাংশের ওপরে থাকবে। এই সমীকরণে শুধুমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকারই (৬৯.৪৪) পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে অজিদের ওপরে থাকার সুযোগ আছে।
তবে ভারত যদি সিরিজটি ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায়, তারপরও অস্ট্রেলিয়ার তাদের ওপরে থেকেই ফাইনালে খেলার সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাকে তাদের মাটীতেই ২-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করতে হবে। সেটি পারলে অজিরা ৬০.৫৩ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে শেষ করবে, যা ভারতের ৫৮.৭৭ পয়েন্ট শতাংশের চেয়ে বেশি। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকা বা নিউজিল্যান্ডের মধ্যে যে কোনো এক দলকে শীর্ষে থেকে শেষ করতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকা (বাকি- ৪ টেস্ট): সবাই যখন অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের ফাইনাল খেলার সম্ভাবনা মেলাতে ব্যস্ত, দক্ষিণ আফ্রিকা বড় দুটি সিরিজে নিজেদের ভাগ্যের পরীক্ষায় নামছে। ৫৪.১৭ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের পাঁচে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা পরের দুই সিরিজে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে। এই দুই সিরিজের ৪তি টেস্টই জিততে পারলে প্রোটিয়ারা ৬৯.৪৪ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে শেষ করবে, যা ফাইনাল খেলার জন্য যথেষ্ট। শুধু অস্ট্রেলিয়ার সামনেই সুযোগ আছে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে বেশি পয়েন্ট শতাংশ অর্জনের।
ভারতকে তাদের মাঠেই হোয়াইটওয়াশ করে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার লড়াই জমিয়ে তুলেছে নিউজিল্যান্ড। তারাও আছে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে। ছবি: বিসিসিআই
তবে প্রোটিয়ারা যদি ৩টি টেস্ট জিততে পারে এবং বাকি টেস্টটি ড্র করে, তবে তারা ৬৩.৮৯ পয়েন্ট শতাংশ এবং যদি ৩ টেস্টে জয় এবং বাকিটিতে হারে, ৬১.১১ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে শেষ করবে। সে ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি দলের তাদের চেয়ে ওপরে থাকার সম্ভাবনা থাকবে। দলগুলো হলো- নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং শ্রীলঙ্কার মধ্যে যেকোনো দুটি দল। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, লর্ডসে আগামী বছর ফাইনালে জায়গা করে নিতে খুব বেশি পয়েন্ট নষ্ট করার সুযোগ নেই দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে।
শ্রীলঙ্কা (বাকি- ৪ টেস্ট): শ্রীলঙ্কার অবস্থাও দক্ষিণ আফ্রিকার মতোই। ৫৫.৫৬ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে তিনে থাকা শ্রীলঙ্কারও হাতে বাকি ৪ টেস্ট। এর মধ্যে দুটি দেশের মাটিতে (অস্ট্রেলিয়া) হলেও বাকি দুটি বিদেশে (দক্ষিণ আফ্রিকা)। শ্রীলঙ্কা এই চার টেস্ট জিতে পূর্ণ ৪৮ পয়েন্ট ঘরে তুলতে পারলে তাদের সংগ্রহ দাঁড়াবে ৬৯.২৩ পয়েন্ট শতাংশ, যা তাদের ফাইনালে জায়গা করে নেয়ার জন্য যথেষ্ট।
তবে যদি তারা তিনটি টেস্ট জেতে এবং বাকি টেস্টটিতে হারে, তাদের পয়েন্ট শতাংশ দাঁড়াবে ৬১.৫৪, যা তাদের ফাইনালে খেলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে, যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের ওপরে থাকবে, তাছাড়া নিউজিল্যান্ড ও ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে যেকোনো এক দলের তাদের লঙ্কানদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
নিউজিল্যান্ড ( বাকি- ৩ ম্যাচ): ৫৪.৫৫ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে এই মুহূর্তে চার নম্বরে আছে নিউজিল্যান্ড। তবে ভারতের বিপক্ষে সিরিজের আগে ফাইনালের লড়াইয়ে তাদের সেভাবে হিসেবেও ধরেননি কেউই। কিন্তু ভারতকে তাদের ঘরের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করে ফাইনালের লড়াইয়ে ভালোভাবেই ফিরে এসেছে টুর্নামেন্টটির প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়নরা।
ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর একটি সিরিজ বাকি আছে তাদের। এই সিরিজের প্রতিটি ম্যাচ জিতে ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করতে পারলে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ দাঁড়াবে ৬৪.২৯ পয়েন্ট শতাংশ। এই পরিমাণ পয়েন্ট শতাংশ যদিও তাদের ফাইনালে খেলার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, কিন্তু তাদের লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখবে। যদি তারা একটি টেস্টে হেরে যায়, তাদের পয়েন্ট শতাংশ নেমে যাবে ৫৭.১৪-এ। তবে সে ক্ষেত্রেও ফাইনাল খেলার আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না কিউইদের।
পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড: এর বাইরে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড গাণিতিকভাবে হলেও ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে টিকে আছে। ৩৩.৩৩ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে বাংলাদেশের ওপরে থাকা পাকিস্তান হাতে থাকা ৪ টেস্টের সবগুলোই জিততে পারে, তারা ৫২.৩৮ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে শেষ করবে। সে ক্ষেত্রে বাকি দলগুলোর ফল যদি তাদের পক্ষে আসে তবে সমীকরণের মারপ্যাঁচে পাকিস্তানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। শ্রীলঙ্কা যদি দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ ব্যবধানে হারে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১-১ ব্যবধানে ড্র করে, ভারত যদি ২-১ ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারে এবং নিউজিল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারে, তবে ৫২.৩৮ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার ঠিক পরে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে।
ইংল্যান্ডের জন্য সমীকরণ আরও কঠিন। যদি তারা হাতে থাকা ৩ টেস্টের সবগুলোতেই নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারে, তাহলে ৪৮.৮৬ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে শেষ করবে। তারা তখনই দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ করতে পারবে, যদি ভারত বাদবাকি টেস্টগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১৩ পয়েন্ট অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ১৮ এবং শ্রীলঙ্কার ১৬ পয়েন্টের বেশি পাওয়া যাবে না।