ডেস্ক নিউজ : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে গিয়ে পতন হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার। আন্দোলন দমন করতে পুলিশ দিয়ে গণহত্যা চালায় শেখ হাসিনা সরকার। পুলিশের ছোড়া গুলিতে নির্মম মৃত্যু হয়েছে শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী ৬ শতাধিক মানুষের।
তবে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে পিছু হঠতে বাধ্য হয় সরকার। পদত্যাগ করে গোপনে দেশ ছাড়েন চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারপ্রধানের দেশ ছাড়ার খবরে সবচেয়ে বেশি পাল্টা আক্রমণের শিকার হয় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। প্রাণ হারাতে হয় পুলিশের নিম্নপদস্থ অনেক কর্মকর্তাকেই।
দেশ ছাড়া ও আত্মগোপনে থাকা কর্মকর্তাদের বাইরে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন। যাদের মধ্যে সদ্য সাবেক আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশ বাহিনী বেশ কয়েকজন আলোচিত কর্মকর্তারা রয়েছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন সরকারের হয়ে নানা আন্দোলন দমনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পুলিশ তথ্য বলছে, কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার মিছিলে নির্বিচার গুলিবর্ষণে ঢাকার মোহাম্মদপুরে মুদি দোকানি আবু সায়েদ হত্যা মামলায় সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে তাকে সিএমএম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। পরে আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আইজিপি হিসেবে যোগ দেন। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পরে তাকে অবসরে পাঠানো হয়।
সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক
ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক আইজিপি শহীদুল হককে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। শুনানিতে নিয়ে আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শহীদুল হক ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আইজিপি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিমএপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াকে গ্রেফতার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। জানা গেছে, ২০১৫ সালে খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান জনিকে পুলিশি হেফাজতে ‘ক্রসফায়ারের নামে হত্যার’ অভিযোগে ডিএমপির তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ বর্তমান ও সাবেক ১৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করা হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপির খিলগাঁও থানায় এ মামলাটি দায়ের করা হয়। জনির বাবা ইয়াকুব আলীর এ মামলা দায়ের করেন।
২০১৯ সালের ১৩ আগস্ট তার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাকে অবসরোত্তর ছুটি বাতিলের শর্তে ১৪ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাস মেয়াদে ডিএমপির কমিশনার পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে নবগঠিত জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।
তাইম হত্যা মামলায় গ্রেফতার পুলিশের ডিসি ইকবাল
গত ২০ জুলাই ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত হন নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইম (১৯)। যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইনসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের মা মোসা. পারভীন আক্তার। একই দিন এই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। নিহত তাইমের বাবা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে উপ-পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফী
আন্দোলনে সাভারে শিক্ষার্থী শেখ আশাবুল ইয়ামিন হত্যা মামলায় ঢাকার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আন্দোলন চলাকালে গত ২৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী ইয়ামিন নিহত হন। গত ২৫ আগস্ট ইয়ামিনের বাবা আব্দুল্লাহ আল কাবির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আব্দুল্লাহিল কাফীকে আটক করা হয়। এরপর ২০১৯ সালে রাজধানীর হাজারীবাগে ইঞ্জিনিয়ার আরিফ মাইনুদ্দিনকে অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের মামলায় গত ৪ আগস্ট কাফীর ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
আবু সাঈদ হত্যায় গ্রেফতার দুই পুলিশ সদস্য
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। দুজনকেই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) হেফাজতে নেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে ওই দুই পুলিশ সদস্যের পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করেন রংপুর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) এসপি জাকির হোসেন। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক আসাদুজ্জামান তাদের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জানা যায়, এ হত্যার ঘটনায় গত ১৮ আগস্ট ১০ পুলিশ সদস্য ও দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করেন সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী। এখন পর্যন্ত এএসআই আমীর আলী ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র গ্রেফতার হলেও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেরয়ে গেছেন।
কোনাবাড়ীতে কলেজছাত্রকে গুলি করে হত্যা মামলায় কনস্টেবল গ্রেফতার
গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানার পাশে গুলি করে কলেজছাত্র মো. হৃদয়কে (২০) হত্যা মামলায় পুলিশের কনস্টেবল মো. আকরাম হোসেনকে (২২) কিশোরগঞ্জের পারাইল এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের হয়ে দমন নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড চালানো পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ। ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপি সদর দফতরের যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, লিটন কুমার সাহাসহ ডিএমপির বিভিন্ন জোনের কর্মকর্তারা।
আত্মগোপন এবং সেনা হেফাজত
বাংলাদেশে গত ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক দলের নেতা, বিচারক, সরকারি আমলা, পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রায় ৬২৬ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫১৫ জনই পুলিশের সদস্য, যাদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা। পরে আশ্রয়গ্রহীতাদের অধিকাংশই নিজ উদ্যোগে পরে সেনানিবাস ছেড়ে চলে যান। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ বা মামলার ভিত্তিতে আশ্রয় গ্রহণকারীদের চারজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছিল। আগস্টের ১৮ তারিখে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
কিউএনবি/আয়শা/১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪,/দুপুর ১:২১