ডেস্ক নিউজ : নানা সফলতার গল্পের সঙ্গে নরসিংদীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। গোটা জেলায় যেমন বেড়েছে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য। তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সন্ত্রাসীদের আধিপত্য। বেড়েছে খুন, রাহাজানি, নারী নির্যাতনসহ নানা অপরাধ প্রবণতা। প্রকাশ্যে নিজ বাড়ির ড্রইং রুমে খুন হয় উপজেলা চেয়ারম্যান, রানিং ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যসহ জনপ্রতিনিধি।
গত ১১ মাসেই জেলা ব্যাপী ৬৭টি খুন হয়েছে। শুধু মে মাসেই জেলায় ৭টি খুন হয়েছে। চলতি মাসে খুন হয়েছে চারটি। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মোট ৭১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক খুন হলেও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না পুলিশ। প্রশাসনের খাতা কলমে ৬৭টি খুনের রেকর্ড থাকলেও এর বাহিরেও রয়েছে নানা অপরাধ। সর্বশেষ পুলিশের উদাসীনতায় ছাত্রদলের দুই নেতা খুন হয় বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন। এরপরও জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি জেলা পুলিশ। ফলে জেলা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ১১ মাসে ৬৭টি খুনসহ নানা অপরাধের তালিকা রোববার (২৬ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। আইনশৃঙ্খলা মিটিং এ উপস্থাপিত জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জুন মাস হতে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত ৬৭টি খুন হয়েছে। নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯৬টি। দস্যুতার দায়ে মামলা হয়েছে ১৪টি, ডাকাতির মামলা হয়েছে ৮টি ও চুরি দায়ে মামলা হয়েছে ৭৭টি। খাতা কলমে এই হিসেব থাকলেও এর বাহির অসংখ্য অপরাধ প্রবণতার ঘটনা রয়েছে।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ খানের নিজ বাড়ির ড্রইং রুমে ডুকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। চলতি মাসের ৮ জুন নরসিংদীর রায়পুরায় আফসানা আক্তার আফসার (২৮) নামে গৃহবধূকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ১২ জুন নরসিংদীর রায়পুরায় আব্দুল করিম (৪৫) এক নৈশপ্রহরীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ২৮ মে নরসিংদীর মনোহরদীতে জাহাঙ্গীর হোসেন (২৭) নামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
এর আগে ২৫ মে ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান (৩২) আশরাফুল নামে দুই ছাত্র নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ৪ মে নরসিংদীর শিবপুরে আইযুবপুর ইউনিয়নের আধঘাটিয়া গ্রামে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হয়েছেন। ২২ এপ্রিল জেলার রায়পুরার নিলক্ষ্যার বীরগাঁও গ্রামে বাড়িতে ঢুকে প্রকাশ্যে জুলহাস মিয়া (২৮) নামে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। ১৭ এপ্রিল নরসিংদীর রায়পুরায় রায়হান নামে ব্যবসায়ীকে জবাই করে ও চোখ উপড়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২০২২ সালের ৩ ডিসেম্বর দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মিটিং চলাকালে নরসিংদীর রায়পুরায় মির্জাচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর ইকবাল মানিককে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
২০২১ সালের ২৮ জুন নরসিংদী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেয় আশরাফুল আজিম (পিপিএম)। তিনি দায়িত্বে থাকাকালিন সময়ের মধ্যে গত ১১ মাসেই আলোচিত এসব হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। প্রায় আড়াই বছর পর গত ১৩ জুন ২০২৩ তার বদলীর আদেশ হয়। তারপরও তিনি স্বপদে বহাল আছেন। এসব মামলা নিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। সর্বশেষ ছাত্রদলের দুই নেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এজাহার ভুক্ত আসামি জেলা ছাত্রদল সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদের খালাতো ভাইকে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। পরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে রফাদফা শেষে তাকে ছাড়ে পুলিশ। পুলিশের ভয়ে ছাত্রদল সভাপতি নাহিদের চাকরিজীবী এক ভাই বাড়িতে আসা ছেড়ে দিয়েছে। এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। মামলার সূত্র ধরে আসামিদের মা-বাবাসহ স্বজনকেও ধরে নিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে। পরে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, জেলা পুলিশের কর্ণধারের অন্যায় আবদার রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হতে হয়েছে। সড়কে রেকার বিল আত্মসাতের ঘটনাও রয়েছে জেলা পুলিশের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে জেলা পুলিশের ব্যবহৃত পরিবহন মেরামতের নামে অর্থ লুটপাট করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশের সাফল্য দেখানোর জন্য ওয়ারেন্টের আসামিকে অস্ত্র মামলা দিয়ে চালান দেয়ার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিব্রত খোদ জেলা পুলিশ একাধিক কর্মকর্তা। পুলিশ সুপারের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থন না করায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে শাস্তি মূলক বদলি করেছেন জেলা পুলিশের কর্ণধার আশরাফুল আজিম।
নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজি নাজমুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকজন রাজনীতিক খুন হয়েছেন। বিষয়গুলো উদ্বেগ জনক। তবে অপরাধ প্রবণতা কমাতে হলে পুলিশ সুপারের পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ শুধু মাত্র পুলিশ একা কাজ করে খুন খারাবি কমাতে পারবে না।
নরসিংদী প্রেসক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, নরসিংদীতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাবহার বেড়ে গেছে। যার ফলে নরসিংদীর চরাঞ্চলসহ জেলায় খুন খারাবি বেড়েছে। বিষয়টি একাধিক বার আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে এসপিকে বলেছি। তার পরও অপরাধ কমেনি। এসপি আশরাফুল আজিমের সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে তিনি বলেন, খাতা কলমে অপরাধের সংখ্যা কম হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এক সময় থানা গুলোতে মাসে ৮০ থেকে ৯০টা মামলা হতো। এখন এতো মামলা নেই। অনেক মানুষ আমাদের কাছে অভিযোগ করেছে থানায় গেলে মামলা নেয় না পুলিশ। মামলা হলে অপরাধীরা ভয় পায়। মামলা না হলে তো অপরাধীরা বেপরোয়া হবেই।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুল কবির খোকন বলেন, পুলিশের উদাসীনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা না নেয়ার নরসিংদীতে ছাত্রদলের দুটি তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হয়ে চিনিশপুর থেকে একটি মিছিল নিয়ে জেলখানার মোড়ে আসতে পারি না। কিন্তু সরকারের এজেন্ট ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নামধারী সন্ত্রাসী মাইনুদ্দিন, অভি ও আনন্দসহ একাধিক সন্ত্রাসীরা কিভাবে অস্ত্র নিয়ে সারাশহর মিছিল করে ঘুরে বেড়ায়? তারা বিএনপির অফিস ভাঙচুরসহ আমাকে মেরে ফেলার জন্য প্রকাশ্যে গুলি করেছে। কিন্তু পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি। বরং পুলিশ উল্টো তাদের উসকানি দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে। একাধিকবার তাদের কাউকে পুলিশ আটকের চেষ্টা করলেও এই পুলিশ সুপার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের গালমন্দ করেছে। তাদের গ্রেপ্তারের বদলে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দিয়েছে। এক কথায় সন্ত্রাসীদের অপরাধ করতে পুলিশ পরোক্ষভাবে মদদ দিয়েছে। যার ফলেই নরসিংদীর আইনশৃঙ্খলা এতো অবনতি হয়েছে। পুলিশ যদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের দায়েরকৃত মামলা গুলো নিতো তাহলে সন্ত্রাসীরা দাবিয়ে বেড়াতে পারতো না।
এমন অসহনীয় পরিস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম তালেব হোসেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই জেলা একটি নিরাপত্তাহীন জেলা। সাংবাদিকদের আরও বেশি বেশি করে এ বিষয়ে লেখালেখি করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আমি ওপর মহলেও এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। আমাদের সরকারের এতো উন্নয়নের পরও আমরা কেন নিরাপত্তাহীন ও বিচারহীনভাবে থাকবো। সাধারণ মানুষ কেন নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করবে। এ অবস্থা কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না দাবি করে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক বলেন, আমাদের চোখ-কান খোলা রেখে এ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের হয়ে আসতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে নরসিংদী পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম (পিপিএম-বিপিএম) ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার ফোন ও ম্যাসেজ পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেন নি। আইনশৃঙ্খলা ও জেলা জুড়ে ৬৭টি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে নরসিংদী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অনির্বাণ চৌধুরী বলেন, এই বিষয়ে কথা বলতে হলে স্টাডি করে বলতে হবে। খাতা-পত্র দেখতে হবে। আপনি অফিসে আসেন। সবকিছু পর্যালোচনা করে বিস্তারিত কথা বলবো।
কিউএনবি/অনিমা/২৮ জুন ২০২৩,/সকাল ৯:২৪