সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে নির্যাতনের ঘটনায় তিন বছরেও ডিসি সুলতানার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবেদন জমা পড়েনি
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
Update Time :
মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০২৩
১৬৯
Time View
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নামে জেলা প্রশাসনের একটি পুকুরের নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনার ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজও জমা পড়েনি। উল্টো অভিযুক্তদের পদোন্নতি সহ চাকরিতে বহাল করেছে সরকার।
গত তিন বছরে আদালতে মামলার কেস ডায়রি উপস্থাাপন হয়েছে। পুলিশের পর তদন্ত ভার পিবিআই-এর ওপর স্থাানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আদালতে প্রতিবেদন জমা পড়েনি। তিন বছরেও নিজের ওপর হওয়া নির্যাতন ও অন্যায়ের বিচার না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন নির্যাতিত সাংবাদিক আরিফ। তিনি বলেন, ‘আসামিরা ক্ষমতাশালী। এদের প্রত্যেককে ইতোমধ্যে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বিভিন্নভাবে মামলাকে প্রভাবিত করে তদন্ত বাধাগ্রস্থা করছে। সরকারও সাংবাদিক নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচারে আন্তরিক নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টে রিট করার পর আদালত রুল জারি করলেও তা উপেক্ষা করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে পদায়ন করা হয়েছে। এদের পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আদালতকে পাশ কাটিয়ে এসব করেছে। এটা দুঃখজনক। আইন-আদালতের প্রতি এমন অবজ্ঞা সরকারি অসাধু কর্মচারীদের অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত করবে।’‘নির্যাতনের শিকার হওয়া আমি প্রথম সংবাদকর্মী নই। সুষ্ঠু বিচার না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। তাই ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। যাতে দেশে আর কোনও সংবাদকর্মীকে এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।’- যোগ করেন আরিফ
বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন কুড়িগ্রামের সাংবাদিক মহল।প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি জাহানুর রহমান খোকন বলেন, প্রত্যেক জনগণ প্রত্যাশা করে সাংবাদিক অন্যায়,অবিচার ও দুর্নীতি বিরুদ্ধে লিখবে কিন্তু এই সাংবাদিক যখন বিপদে পড়ে তখন সাধারণ মানুষ খুব একটা সেই সংবাদটির পক্ষে দাঁড়ায় না।সাংবাদিকের পক্ষে গুটিকয়েক সাংবাদিক অবস্থাান নেয় কিন্তু দুঃখের বিষয় হল মফস্বল শহরে সাংবাদিকদের ২-৩ টা গ্রুপ থাকার কারণে কোন একটি পক্ষ সেই সাংবাদিকদের পক্ষে অবস্থাান নিলে বাকি সংগঠনগুলি তার পক্ষে অবস্থাান নেয় না।
বাংলাদেশ খবরের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম বলেন,আরিফুর ইসলাম রিগ্যান এর ঘটনায় আমলারা সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিচার প্রক্রিয়া কোন দিকে যাচ্ছে বলা যাচ্ছে না। যেমনটি আমরা দেখেছি সাগর রুনির ঘটনায়। তদন্ত প্রক্রিয়া ৯৫ বার পেছানো হয়েছে।আমি মনে করি এটা বিচার বিভাগের ব্যর্থতা,বিচার বিভাগ সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের ঘটনাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে সাধারণ মানুষের আস্থাা ফিরয়ে আনবে এটই প্রত্যাশা করি। মামলা সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন ও জেলা প্রশাসনের সাবেক তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার তদন্তভার বর্তমানে পিবিআইয়ের কাছে রয়েছে। আরিফের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের এপ্রিলে পিবিআই এ তদন্তভার পেলেও এখনও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই, রংপুরের পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপ‚র্ণ ও আলোচিত মামলা। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সহ আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত কাজ করছি। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো।’মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই, রংপুরের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার তিন বছর হলেও পিবিআই তদন্ত ভার পাওয়ার এক বছর হচ্ছে।
বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের জন্য আগের তদন্ত কর্মকর্তার নেওয়া সাক্ষ্য প্রমাণ আমরা যাচাই করছি। সমস্ত স্বাক্ষিদের ডেকে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যেহেতু মামলাটি মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনার ভিত্তিতে হয়েছে, সে নির্দেশনাগুলো প্রতিপালনের চেষ্টা করছি। এটি যাতে একটি ক্রেডিবল তদন্ত হয় সেটি মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি। আশা করছি দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো।’ তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনও সময় জানাননি পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।
এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআই এসপি বলেন, ‘তদন্তে কোনও চাপ নেই। আমাদের বাধা বা চাপ দিয়ে কোনও লাভ নেই, আমরা সেরকম কিছু ফেইস করছি না।’সাংবাদিক আরিফের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে আমরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি। পুলিশ প্রবিধানমালা ১৯৪৩ এর ২৬১ প্রবিধান অনুসারে বিরতিহীনভাবে তদন্তকার্যক্রম চালালে সবচেয়ে জটিল মামলার তদন্ত শেষ করতেও ১৫ দিনের বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমরা প্রত্যাশা করি আইনের শাসনের স্বার্থে মামলাটির তদন্ত কাজ শেষ করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
উলেখ্য ২০২০ সালের ১৪ মার্চ প্রথম প্রহরে ঘুমন্ত আরিফুল ইসলামের বাসার ঘরের দরজা ভেঙে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় স্ত্রী-সন্তানের পাশ থেকে। তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার ভয় দেখিয়ে জেলা শহরের ধরলা ব্রিজের প‚র্ব পাড়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে বিবস্ত্র করে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন ওই সময়ের আরডিসি নাজিম উদ্দিন, এনডিসি রাহাতুল ইসলাম ও মোবাইল কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাসহ জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা। আরিফের বাড়িতে কোনও তল্লাশি না চালালেও তার কাছ থেকে আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে মোবাইল কোর্টের নামে সাজা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মধ্যরাতে বাড়ি থেকে একজন সাংবাদিককে ধরে এনে সাজা দেওয়ার ঘটনায় দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
গণমাধ্যমে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় পরদিন ঘটনাস্থালে যান রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন ও সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।
১৫ মার্চ পরিবারের আবেদন ছাড়াই আরিফের জামিনের ব্যবস্থাা করে জেলা প্রশাসন। কারামুক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর থানায় এজাহার দায়ের করেন সাংবাদিক আরিফ। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে সে বছর ৩১ মার্চ মামলা রেকর্ড করে কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশ। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আরিফকে দেওয়া সাজা স্থাগিত করা হয়।