বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন

চৌগাছায় বাল্য বিয়ে দিতে গিয়ে অভিভাবক জেলে অর্ধাহারে পরিবারের সদস্যরা

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি ।
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২
  • ১১৫ Time View

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর) : যশোরের চৌগাছায় বাল্য বিয়ে দিতে গিয়ে অবিভাবক জেলে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে পরিবারের সদস্যরা। বাল্যবিয়ের দেওয়ার অপরাধে উজেলার চারটি পরিবারের চার জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমান করেন আদালত। পরিবারের আয়-উপার্যন বন্ধ হওয়ায় তাদের অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। সরেজেমন এসব পরিবারের গুলোর অবস্থা জানতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এক করুন চিত্র। বৃদ্ধ বাবা-মা মিলে পরিবারে ৭ জন সদস্য । ১ ছেলে ২ মেয়ে। সবাই স্কুলে যায়। অন্যের জমিতে কোনো রকমএকটি ঝুপড়িতে পরিবার নিয়ে বাস করি। আমার মাঠেও কোনো জমি নেই।

একদিন ভ্যান না চালালে সেদিন পরিবারের মুখে খাবার উঠেনা। আমার বড় মেয়ে গ্রামের স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তার স্কুলের কাগজে বাস্তব বয়সের চেয়ে কম হয়ে গেছে। স্কুলে যাওয়ার পথে বেশ কয়েকবার এলাকার বকাটেরা মেয়েকে উত্যাক্ত করেছে। এ বিষয়ে হেডস্যারকে কয়েকবার বলেছি। এলাকার গন্যমাণ্য ব্যাক্তিদেরকেও বলেছি। কোন সমাধান হয়নি। রাস্তায় ঝামেলার ভয়ে মেয়ে যখন স্কুলে যাতি পারছিলনা, তখন কেউ আমার পাশেআসেনি। একটা ভালো ঘরের ছেলে পাইছি বলে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয়। এখন বাড়িতে পুলিশ এসে ৯ মাসের জেল ও জরিমানা করেছে। ১ আগষ্ট সরেজমিনে গেলে কথাগুলো বলছিলেন উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের বাল্যবিবাহর শিকার দশম শ্রেণি পড়–য়া এক হতভাগা মেয়ের ভূমিহীন ভ্যানচালক বাবা।

ভূমিহীন ভ্যানচালক পিতা আরো বলেন, যে ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে সেই ছেলের মামা আজিজুল ইসলামকে ৯ মাসের জেল ও জরিমানা করা হয়েছে। আজিজুল ইসলামও একজন ভ্যান চালক। তার পরিবারেও ৫/৬ জন সদস্য। পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যাক্তি জেলে। পরিবারের সদস্যরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। বরের মামা আজিজুল ইসলাম ঝিনাইদাহ জেলার সদর থানার খড়িখালি গ্রামের বাসিন্দা। সরেজমিনে পাতিবিলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর সংসারে একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যাক্তি জেলে থাকায় দিশেহারা বৃদ্ধা স্ত্রী। বাড়ির বাহিরে চরাটেরউপরে বসে রয়েছেন বৃদ্ধা।

এ সময় তার ছেলের বৌ ও প্রতিবেশিরা জানান, বৃদ্ধার তিন ছেলে। ছোট ছেলে ভ্যানের চাকায় চলে সংসার। আর এই ছেলের মেয়েকে বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে জেল খাটছেন তিনি। বড় ছেলে আলমসাধু চালিয়ে দিন আনা দিন খাওয়া উপর্জন করে। মেজো ছেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। প্রতিবেশিরা জানান, বৃদ্ধার নিজের কোনো ঘর নেই। অন্যের ঘরে বসবাস করে পুতনিকে (ছেলের মেয়েকে) লেখাপড়া করাচ্ছিলেন। একদিকে অভাবের সংসার অন্যদিকে পাত্র পক্ষের আগ্রহ। এ কারনেই বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল বলে জানায় তারা। মেয়ের দাদী বলেন, আমরা কাজীর কাছে গিয়ে বললে কাজী বিয়ে পড়াতে রাজি হয়নি। ছেলে পক্ষের সাথে কথা বলে আমার সিদ্ধান্ত নিই এখন আর বিয়ে দেবনা। এ সময় বাড়ীতে প্রশাসনের লোকজন আসে। আমরা স্যারদের সত্যি কথাগুলা বলেছিলাম।

তার পরেও স্যারেরা কথা শুনিনি। ধরে নিয়ে চলে যায়। বর্তমানে অন্যের দেওয়া খাবার খেয়ে দিন কাটছে বৃদ্ধা দাদীর। সম্প্রতি বাল্য বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া পাতিবিলা গ্রামের স্কুল ছাত্রীর দাদা বৃদ্ধ আব্দুস ছালাম (৭০) ৬ মাসের জেল ও জরিমানার শাস্তি ভোগ করছেন। এছাড়া উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামের দশম শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রীর বিয়ে আয়োজন করার অপরাধে নানাকে ৯ মাসের জেল ভোগ করতে হচ্ছে। অস্বচ্ছল জামায়ের অভাবের সংসারে ঠিকমত তিনবেলা খাবার জোগাড় হয়না। এজন্য নাতনীকে নিজের বাড়ীতে রেখেছিল। এই পরিবারেরও বৃদ্ধ নানা একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যাক্তি। তিনি জেলে থাকায় পরিবারের সদস্যদের দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

উপজেলার সুধিজনদের মন্তব্য, দন্ডিতের সাথে দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার । ন্যায়বিচার ঘৃণা করে পাপকে, পাপীকে নয়। বিচারকের জন্য সে কথাই প্রয়োজ্য। ব্যক্তি মানুষের অপরাধ প্রবণতার পেছনে কেবল যে অপরাধি ব্যক্তি নিজে দায়ী থাকে তা নয়, অনেক সময় পরোক্ষভাবে সমাজও তাকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। সুধিজনরা বলছেন, সম্প্রতি উপজেলার ডন্ডিত চারটি পরিবাইরই সমাজের সবচেয়ে নি¤œ আয়ের পরিবার। এদের তিনটি পরিবার অপরাধ করতে যাচ্ছিল অপরাধ এখনো সংঘঠিত হয়নি। সে ক্ষেত্রে শাস্তি আরো কম হলেও হতো।

বাল্যবিবাহ বন্ধ আইনের একটি ক্লজে বলা আছে, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর, তবে বাবা-মা ইচ্ছে করলে পারিপার্শ্বিক কারণে ১৬ বছর বয়স হলেই মেয়েদের বিয়ে দিতে পারবেন। অন্য একটি ধারায় বলা হয়েছে বিবাহ স¤পন্ন না হলে মুচলেকা বা ব্রন্ড প্রদান করে শর্তানুযায়ি নিজ এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধে আগ্রহী হলে তাকে শাস্তি হতে অব্যহতি প্রদান করা যাবে। উল্লেখ্য ২৯ জুলাই রাতে উপজেলার পাতিবিলা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত দশম শ্রেণির স্কুল ছাত্রীর বিয়ে বন্ধ করেন।

এ সময় মেয়ের দাদাকে একশত টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের জেল দেওয়া হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরো পনের দিনের জেল। একই দিন রাতে হাকিমপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিয়ে বন্ধ করতে না পারলেও বরের মামাকে ৯ মাসেরজেল দেন ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট গুনঞ্জন বিশ্বাস। পরেরদিন ৩০ জুলাই দুপুরে উপজেলার সুকপুকুরিয়া ইউনিয়নের আন্দুলিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে দশম শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রীর বিয়ে বন্ধ করে কনের নানাকে ৯ মাসের জেল ও একশত টাকা জরিমানা করেন। একই দিন উপজেলার মাড়–য়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে একটি বাল্য বিয়ে বন্ধ করে মেয়ের দুলাভাইকে ৯ মাসের জেল ও একশত টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমান আদালত।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৪ অগাস্ট ২০২২, খ্রিস্টাব্দ/রাত ৮:৪৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit