ডেস্কনিউজঃ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ডলার পাচারকারী ও অর্থ লুটেরাদের বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষে আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়া দেন তিনি। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের বাজেট নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু গবেষকরা বলছেন বর্তমানে মূল্যস্ফীতি রয়েছে ১২ শতাংশ। বিএনপি মনে করে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে মূল্যস্ফীতি বাস্তবে আরো অনেক বেশি। প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসায়ী বান্ধব, মধ্যবিত্তদের কোনো স্বস্তি দেয়নি’।
তিনি বলেন, ‘এটি স্রেফ ‘ডলার পাচারকারী ও অর্থ লুটেরাদের বাজেট‘। কারণ পাচারকারীদের অর্থ নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা বিদেশে ভোগ করার বৈধতা দিতেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। আরো পরিস্কার অর্থে বললে, সরকারের লুটেরা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও স্বজনদের অর্থ পাচারের সুযোগ দিতেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে’।
এক প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি কাজ করছে না। এখন কাজ করছে আওয়ামী ইকোনমিক মডেল’।
পাচার করা অর্থ দেশে ফেরাতে ‘কর ছাড়’-এর প্রস্তাব আইনের পরিপন্থী অভিহিত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই প্রস্তাব কেবল অনৈতিক নয়, এটা রীতিমতো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দুর্নীতি ও অর্থপাচারকে ক্ষমা ঘোষণার শামিল। এতে বর্তমানে চলমান অর্থ পাচারের মামলাগুলোর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অর্থ পাচারকারীরা আরো উৎসাহিত হবে, টাকা আরো পাচার হওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে। এটা অন্যায়, অপরিণামদর্শী ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ’।
তিনি বলেন, ‘যেখানে পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনা আইনগতভাবে প্রত্যাশিত, সেখানে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের তথাকথিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অসাংবিধানিক। গত ১৪ বছরে সরকারের ঘনিষ্ট লোকজন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এখন এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার ওইসব পাচারকারীদের অবৈধ অর্থ বৈধ করার ঢালাও সুযোগ দিলো। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক যেকোনো মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য’।
‘আমরা পাচার করা অর্থ বৈধ করার এই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ‘অবিলম্বে পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও তাদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পাচারকারীদের অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি’।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কার্ব মার্কেটে ডলারের দামের চলমান অস্থিরতার সুযোগে কালো টাকার মালিকরা বাজার থেকে যে কোনো অংকের বিনিময়ে ডলার কিনে কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করে ঘোষণাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামান্য কর পরিশোধ করে তা বৈধ করার প্রয়াস পাবে। এতে ডলার মূল্যে অস্থিরতাও আরো বাড়বে। সাধারণ মানুষের নিত্য ব্যবহৃত চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি ও গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মূল্য হ্রাসের কোনো কার্যকরী কৌশল না নিয়েই শুধুমাত্র নিজেদের বিত্ত বৈভব বৃদ্ধির লক্ষ্য এই বাজেট প্রণীত হয়েছ ‘।
প্রস্তাবিত বাজেট সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংক বলেছে, চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। আর নতুন অর্থবছরে (২০২২-২৩) জিডিপির প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ’।
তিনি বলেন, ‘সরকার অবশেষে স্বীকার করেছে বহিঃস্থ এবং কিছু অভ্যন্তরীণ কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ যা উইশফুল থিংকিং ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যয় প্রবাহ কীভাবে সংকোচন করা হবে- তার কোনো রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না’।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রধান টার্গেট। কিন্তু বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে কি করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি করলে উৎপাদন মূল্য বেড়ে মুনাফা কমবে। তাহলে বিনিয়োগও কমবে। সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্যতা কমবে। এই পটভূমিকায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি শুধু আশাই থেকে যাবে। অথবা দিনের শেষে আগের মতো পরিসংখ্যানের গোঁজামিল দিয়ে উন্নয়ন প্রহসনের সৃষ্টি করা হবে’।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি পেনশনারদের পেনশন ভাতা বাবদ বরাদ্দ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের অধিকার। এটা সামাজিক সুরক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্ত করে সুরক্ষা খাতের কলেবর বৃদ্ধির ঘোষণা এক ধরনের প্রতারণা। অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়ে বলেছেন। অথচ এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির বিষয়। এখানে তিনি হাত দিতে পারেন না। অথচ দুষ্ট চক্রের কবলে বন্দি ব্যাংক খাত নিয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো কথা বলেননি। যদিও খেলাপি ঋণের বিষয় এবং ব্যাংকগুলোর দীনতা ইত্যাদি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দরকার ছিল’।
প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দিকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই বাজেট হচ্ছে অব দ্য বিজনেসম্যান, বাই দ্য বিজসেনম্যান এবং ফর দ্য বিজনেসম্যান। অর্থাৎ এটি ব্যবসায়ী বান্ধব বাজেট। জনকল্যাণের কোনো কথা এতে স্থান পায়নি। মূল্যস্ফীতিতে জনমানুষের যখন নাভিশ্বাস, তাদের স্বস্তি দেওয়ার কোনো নেই। করমুক্ত আয়সীমা বাড়েনি, স্বস্তি পায়নি মধ্যবিত্তরা। বাজেটে যেসব পণ্যের আমদানি কর বাড়ানো হয়েছে সেগুলোর ভোক্তা মূলত মধ্যবিত্তরাই’।
তিনি বলেন, ‘মেডিটেশনের ওপরও ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। অতি দরিদ্রদের কাছে ১০ টাকা দরে যে সামান্য কিছু চাল বিক্রি হতো তার দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সয়াবিন তেল এখন সরকারই নির্ধারণ করে দিলো ২০৫ টাকা। ৩৫ দিনের মাথায় এ নিয়ে দুই দফা সয়াবিন তেলের দাম বাড়লো’।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাজেটে সাধারণ করদাতারা তেমন কোনো সুখবর পাচ্ছেন না। ধনিক শ্রেণির করপোরেট কর কমানো হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আগের মতোই তিন লাখ টাকা পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তদুপরি ৪ কোটির মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে করের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে’।
‘একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান অপরদিকে ল্যাপটপ আমদানিতে ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ ল্যাপটপ ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সবকিছুই অচল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৫ শতাংশ কর মানেই হলো শিক্ষা সংকোচন নীতি যা বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক’।
তিনি বলেন, ‘হতদরিদ্র ও নিঃস্ব জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মাত্র ০ দশমিক ৮৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভেতরে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। নিত্যপণ্যের দাম ব্যাপক বাড়লেও বয়স্ক ভাতা বাড়ানো হয়নি। কৃষিখাত, মাছ চাষ, মুরগী ও গরু পালনে আয় কর আরোপ করা হয়েছে। এরা কৃষি সেক্টরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দেবে না। অথচ মেগা প্রজেক্টের ব্যয় ঠিকই বহাল রাখা হয়েছে। এ বাজেট জনগণের জন্য নয়, এ বাজেট ডলার পাচারকারী ও অর্থ লুটেরাদের বাজেট। এবারের বাজেট বর্তমান কঠিন সময়ের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ‘বাস্তবতা বর্জিত’ একটি বাজেট। এটি কেবলমাত্র সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদের জন্যই করা হয়েছে’।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। বলা হচ্ছে কোনো অর্থই বিদেশ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, ঠিকাদারকে যদি বাংলাদেশ মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করা হয়- তাহলে সেতু নির্মাণে ডলারের বিনিময়ে আমদানি করা পণ্য কীভাবে আনা হয়েছে, অথবা ঠিকাদার তার লভ্যাংশ কোন মুদ্রায় তার দেশে নিয়ে যাবেন?’
কিউএনবি/বিপুল/১১.০৬.২০২২/ রাত ১১.২৬