বাদল আহাম্মদ খান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়ার অভিযোগ আমলে নিবে উপজেলা আওয়ামী লীগ। চাকরি বিষয়ে কেউ যদি টাকা নিয়ে থাকে তাহলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।শনিবার দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানানো হয়। এ সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. তাকজিল খলিফা কাজল এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আখাউড়ার একজনকে চাকরি দিয়ে চার লাখ টাকা নেয়য় কসবার এক ব্যক্তি। বিষয়টি জানার পর তার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এমন যদি আরো থাকে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’ আওয়ামী লীগের এ নেতা এ সময় জামায়াত-বিএনপি’র কেউ চাকরি পেয়ে থাকলে কিংবা চাকরি দেওয়ার নামে কেউ টাকা নিয়র থাকলে খোঁজ নিয়ে জানানোর জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহবান জানান। পাশাপাশি দলীয়ভাবেও খোঁজ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমার বরাত দিয়ে যা বলেছেন সেটা সঠিক হয়। আমি শুধু বলেছি মন্ত্রী যাদের চাকরি দিয়েছেন তাদের অনেকে অকৃতজ্ঞ। চাকরি পাওয়াদের অনেকে একটি অনুষ্ঠানে না যাওয়ার প্রেক্ষিতে আমি কথাটা বলেছি। কিন্তু তিনি সংবাদ সম্মেলন করে মিথ্যা অপপ্রচার করেছেন।’উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আখাউড়ায় তোলপাড় শুরু হয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা উপজেলা চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেন। উপজেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে একই দাবি তুলেন।
শনিবারে সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকায় বেশি কাজ করানোর অভিযোগ আনা হয়। বিআরডিবি, যুব উন্নয়ন, কৃষি অফিস, সমাজসেবা অফিসের নানা প্রকল্পে চেয়ারম্যান অনিয়ম করেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। তবে কি এসব অফিসে দুর্নীতি হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, চেয়ারম্যান সেখানে প্রভাব খাটাচ্ছেন।চটেছেন ইউপি সহকর্মীরা দলের কারো কারো কর্মকান্ডে নিজ সংসদীয় এলাকায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এম.পি’র অর্জন ম্লান হওয়ার আক্ষেপ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া। এর ঠিক দু’দিন পর ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চটেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা।
শুক্রবার সকালে মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে হওয়া সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন অভিযোগ এনে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করা হয়। ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা এ সময় আবুল কাশেম ভ‚ঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রমাণপত্রসহ কিংবা বড় ধরণের কোনো অভিযোগ আনতে না পারলেও কাজ বন্টনে নিজের এলাকাকে প্রাধান্য এবং একই জায়গায় বারবার কাজ দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করেন।সংবাদ সম্মেলনের ব্যানের ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের উদ্যোগে এ আয়োজনের কথা বলা হলেও আখাউড়া পৌরসভার মেয়র মো. তাকজিল খলিফা কাজল, জেলা পরিষদ সদস্য আতাউর রহমান নাজিমসহ যুবলীগ, ছাত্রলীগের কয়েক নেতা এতে উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখিত দু’জনও তাঁদের বক্তব্যে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনেন। তাকজিল খলিফার পছন্দের লোক হিসেবে আবুল কাশেম ভ‚ঁইয়া দলীয় ‘মনোনয়ন’ পাওয়ার পাশাপাশি এখন তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা টানাপোড়েনের আলোচনাও আছে এলাকায়। তাকজিল খলিফা এ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।
উপজেলা চেয়ারম্যানের সংবাদ সম্মেলন গত মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. আবুল কাশেম ভূইয়া। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, বিতর্কিত অন্যান্য কর্মকান্ডের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে চাকরি দিতে কেউ কেউ সহযোগিতা করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ভালো অর্জনকে ম্লান করা হচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে কারো নাম উল্লেখ করেননি। এ সময় মন্ত্রীর বিভিন্ন কাজের প্রশংসা ও কিছু উদাহরণ এবং মন্ত্রীর প্রতি নিজের আনুগত্যের কথা তুলে ধরে আরো বলেন, ‘আইনমন্ত্রী মহোদয় একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষ। নি:স্বার্থভাবে তিনি উন্নয়ন কাজ থেকে শুরু করে চাকরি দিয়ে যাচ্ছেন। ওনার কাজে আমাদের মতো এলাকার মানুষ খুশি। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে কারো কারো কারণে মন্ত্রীর এসব অর্জন ¤øান হতে চলেছে। চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বিষয়ে মন্ত্রীকে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দলের একজন সিনিয়র নেতাও চাকরি বিষয়ে আমার কাছে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। চাকরি পেয়েছেন এমন অনেককে তিনি ওই অনুষ্ঠানে যেতে বলায় নাকি এক প্রকার ‘অন্যরকম’ উত্তর দিয়েছেন। এটা মন্ত্রীসহ আমাদের দলের জন্য বাজে বিষয়। কিন্তু দলীয় ফোরামে এসব বলার মতো পরিবেশ নেই। এসব কথা বলা যাচ্ছে না।’সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেদিন চাকরিজীবীদের এক আয়োজনে গিয়ে কিছু কথা শুনে হতাশ হতে হয়। মন্ত্রী চাকরি দিয়েছেন এমন অনেকে ওই অনুষ্ঠানে আসেননি। আসার বিষয়ে তাদের আগ্রহও ছিলো না বলে জেনেছি। এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন, যা শুনে মনে কষ্ট পাই। এভাবে মন্ত্রীর অর্জন ম্লান করতে দেওয়া যায় না। ওনি অত্যন্ত ভালো মানুষ।’এ সংবাদ সম্মেলনের পর থেকেই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মী আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনিয়মে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের হাত রয়েছে উল্লেখ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। যদিও এ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে দাপ্তরিকভাবে দায়িত্বে নেই উপজেলা চেয়ারম্যান। নিজের ফেসবুক আইডি থেকেও চেয়ারম্যান এ কথা জানান দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
এ অবস্থায় আগের বিষয়টিকে বাদ দিয়ে এখন উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করা হয়। অভিযোগ করা হয়, উপজেলা চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা নিজ এলাকায় কাজ করতে পারছেন না। উপজেলা চেয়ারম্যান তার নিজ এলাকায় কাজ নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া একই প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাত করছেন। নিয়ম অনুযায়ি প্রকল্প কমিটিও করা হচ্ছে না। সংবাদ সম্মেলনে আখাউড়া পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. তাকজিল খলিফা কাজল বলেন, ‘উনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে আমি বলে আসছি সমবন্টন করার জন্য। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। তিনি বেশ অনিয়মের জড়িয়ে গেছেন।’
উপজেলা চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিষয়টি আপনাদের উপর পড়লো কি-না কিংবা এটার উপর ভিত্তি করে সংবাদ সম্মেলন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ মতিন বলেন, ‘চেয়ারম্যানের কথার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা আরো আগে থেকেই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছি। আমার অভিযোগ হচ্ছে ওনি আমার এলাকার বরাদ্দ ওনার এলাকায় নিয়ে গেছেন, যেটা তিনি পারেন না।’উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার কথায় যাদের আঁতে ঘা লেগেছে তারাই এটা করছে। মন্ত্রী মহোদয়ের মতো একজন সৎ ও ভালো মানুষের বিরুদ্ধে বলার কিছু সুযোগই নেই। কিন্তু কেউ কেউ এখন অপপ্রচার চালিয়ে আমার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে আমি কথা বলবো। কোথায় কিভাবে কি কি অনিয়ম হচ্ছে সেগুলো তুলে ধরবো। এরপর ওনি যেভাবে নির্দেশনা দেন সেভাবে আমি এগুবো।’
কিউএনবি/আয়শা/১৪ই মে, ২০২২/৩০ বৈশাখ, ১৪২৯/বিকাল ৪:২১