শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ন

যে কারণে জামায়াতকে সন্দেহ বিএনপির

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৪ Time View

ডেস্ক নিউজ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে। সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দলের মতবিরোধের মধ্যেই সামনে এসেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কথিত আঁতাতের অভিযোগ। 

বিএনপির শীর্ষ নেতারা এ অভিযোগ তুললেও জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ এনেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

সম্প্রতি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অর্থায়ন রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে একটি পক্ষ এবং দেশের ভেতরে আরেকটি রাজনৈতিক দল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তোলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। তার দাবি, জামায়াতের বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনেও আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দিয়েছে, দলীয় কার্যালয় বন্ধ রেখেছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দিয়েছে। এমন একটি দলের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। উল্টো বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার অভিযোগ তুলে আযাদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পেলেও জামায়াতকে বিভিন্নভাবে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রিজভীর দাবি, জামায়াত এখন যে আন্দোলন করছে, সেখানেও আওয়ামী লীগের যোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, জামায়াত এখন চেষ্টা করছে গোপনে অমুকের সঙ্গে মিলে কিভাবে সরকারকে ঘায়েল করা যায়, তাকে কিভাবে দ্রুত ফেলে দেওয়া যায়। কিন্তু এটা করতে গিয়ে যে মহাবিপদ চলে আসতে পারে এবং তাতে যে তাদেরও লাভ হবে না, সেই সেন্সটা কাজ করছে কিনা এটা আমার যথেষ্ট সন্দেহ।।

তবে শুধু গোয়েন্দা তথ্য কিংবা সরকার পতনের চেষ্টা নয়, তৃতীয় আরেকটি কারণেও জামায়াত-আওয়ামীলীগ আঁতাতের ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি। সেটা হচ্ছে, জুলাই সনদ এবং সংবিধান নিয়ে ‘অচলাবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা’।

সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধ

বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান দূরত্বের অন্যতম কারণ সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য।

জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। অন্যদিকে বিএনপি সনদে থাকা যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

সংবিধান নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। জামায়াত সংবিধানে ব্যাপক সংস্কার চায়। অন্যদিকে বিএনপি বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পক্ষে।

এ নিয়ে বিরোধী দলগুলো সংসদে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ বর্জন করেছে। রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর দাবি, বিরোধী দলগুলো সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে অনড় অবস্থান নিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। এতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নয়; বরং তাদের কাছে এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ অবশ্য বিএনপির বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তার অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ সামনে আনছে।

আওয়ামী লীগের বক্তব্য কী?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে দেশত্যাগ করেছেন, আবার অনেকে বিভিন্ন মামলায় বিচারের মুখোমুখি।

বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি আঁতাতের অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা করে রাজনীতি করছে না।

তার দাবি, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে থেকে জনগণের জন্য কাজ করে।

রাজনীতিতে আবারও প্রাসঙ্গিক হচ্ছে আওয়ামী লীগ?

বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস।

তার মতে, দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলে কার্যত দলটিকেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কার আঁতাত রয়েছে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেশের রাজনীতিতে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ও গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করছে না।

অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, জনগণের সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে দোষারোপের পুরোনো ধারায় ফিরে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের মতপার্থক্যের মধ্যে আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেশের রাজনীতিতে আরেকটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। 

বিবিসি বাংলা

 

 

কিউএনবি/আয়শা/৩১ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৯:১৯

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit