ফার্স্টডেট সেবায় যুক্ত হতে আগ্রহী সরকারি কর্মীদের শুরুতেই জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়পত্রের (সিঙ্গাপুরের নিজস্ব ডিজিটাল আইডি) মাধ্যমে সাইন ইন করতে হয়। এরপর একটি বিশদ জরিপ পূরণ করার মাধ্যমে তারা নিজেদের পছন্দ, ব্যক্তিগত অভ্যাস, জীবনবোধ এবং ভবিষ্যৎ মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পাওয়া পারস্পরিক পছন্দ অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও সম্ভাব্য সঙ্গীকে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২৯ বছর বয়সী তরুণী এলিজাবেথ সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি জানান, যেকোনো অ্যাপের মাধ্যমে কারও সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা হয়তো খুব বেশি ভিন্ন হবে না, তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ায় এই প্ল্যাটফর্মে কোনো ভুয়া প্রোফাইল বা প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকবে না। একই খাতের সহকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথ সুগম হওয়ায় তিনি এটি ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে এই উদ্যোগ চালু হওয়ার পর থেকেই নাগরিকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সিঙ্গাপুর সরকারের এই পদক্ষেপকে খানিকটা ‘একনায়কতান্ত্রিক’ বা বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করেছেন। সমালোচকদের প্রধান ক্ষোভ হলো, এই সুবিধাটি কেন কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সীমিত রাখা হলো এবং কেন ৩৫ বছরের বেশি বয়স্কদের এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কেউ কেউ অভিযোগ করে বলছেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকদের সুখ-সমৃদ্ধি বা ভালো সঙ্গী খোঁজা নয়, বরং জন্মহার বাড়ানো। বয়স ৩৫ পার হয়ে গেলে নারীদের মা হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায় বলেই সরকার হয়তো অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ সিঙ্গাপুরবাসীদের এই হিসাব থেকে বাদ দিয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
প্রকৃতপক্ষে এই পাইলট প্রকল্পটি ভবিষ্যতে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে এই পুরো উদ্যোগের পেছনের আসল প্রেক্ষাপট অত্যন্ত করুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতিহাসজুড়ে সিঙ্গাপুরের জন্মহার কখনোই এতটা তলানিতে নামেনি। গত ষাট বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে দেশটির মোট নবজাতকের সংখ্যা ৩০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। ঠিক একই সময়ে বয়োবৃদ্ধ দেশের তালিকায় স্থান করে নেওয়া সিঙ্গাপুরে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছাব্বিশ হাজারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে চলতি বছরের আগস্ট মাসেই প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং তরুণ দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে এক গুচ্ছ অর্থনৈতিক উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। নতুন এই নীতির আওতায় একটি সন্তান ১৭ বছর বয়সে পদার্পণ করা পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলারের মেয়াদি আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এরপরও যখন তরুণ সমাজকে পরিবার গঠনে আশানুরূপভাবে রাজি করানো যাচ্ছিল না, তখনই মূলত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই সরকারি ম্যাচমেকিং উদ্যোগ সামনে আনা হলো।
সূত্র: বিবিসি