বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ন

হাতিরা নিজের চিকিৎসায় ব্যবহার করে ঔষধি গাছ, বলছে গবেষণা

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ Time View

ডেস্ক নিউজ : আফ্রিকান হাতিরা অসুস্থ হলে নিজেদের ও তাদের পরিবারের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের ডজনখানেক ঔষধি গাছ ব্যবহার করে।

কেনিয়ার মাউন্ট এলগন অঞ্চলে হাতিদের সঙ্গে বসবাস ও কাজ করা মানুষদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বিস্ময়কর আচরণের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় এই হাতি। এদের ‘লবণ-খননকারী হাতি’ও বলা হয়। কারণ, তারা গুহার ভেতরে গিয়ে দাঁত দিয়ে পাথর ঘষে নিজেদের খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সংগ্রহ করে।

সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, এই হাতিগুলো বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।

গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ড. এলোডি ফ্রেইম্যান বলেন, বনাঞ্চলের আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে প্রাণী, এমনকি মানুষও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এই গবেষণা প্রশ্ন তুলেছে। “মানুষ ছাড়াও প্রাণিজগতের সঙ্গে আমাদের ওষুধপত্র কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, এটা তা-ই দেখিয়ে দেয়,” বিবিসি নিউজকে বলেন ড. ফ্রেইম্যান। 

সংরক্ষণবিষয়ক দাতব্য সংস্থা মাউন্ট এলগন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তি ও বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নেন।

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে, হাতিরা অসুস্থ বোধ করলে নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ বেছে নেয় এবং মা হাতিরা তাদের শাবকদের ঔষধি অংশটি খাওয়ায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, হাতিরা ৩৫টি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ব্যবহার করে। এর মধ্যে ২৫টি উদ্ভিদের ঔষধি ব্যবহার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় সাক্ষাৎকারদাতাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে, যাতে তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারেন।

তাদের দেওয়া তথ্যে বেশ কিছু চমকপ্রদ বিবরণ উঠে এসেছে। একটি সাক্ষ্যে, একজন বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক বলেন, তিনি হাতিদের ‘অঙ্গুরউইট’ নামে পরিচিত একটি উদ্ভিদ “শাবকদের ওষুধ হিসেবে দিতে” দেখেছেন।

পেটব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসায় অঙ্গুরউইট ব্যবহার করা হয়। ওই পর্যবেক্ষক জানান, হাতিমায়েরা নিজেদের মুখে এটি মিশিয়ে নেয়—”পাতাগুলো সরিয়ে নিয়ে অন্য কিছু গাছের শিকড়ের সঙ্গে চিবিয়ে মসৃণ করে ফেলে।” 

এমনকি হাতিমায়েদের এই উদ্ভিদজাত উপাদান নিজেদের দুধের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। “তারা এটি শাবকদের দেয়। শাবকেরা নিজেরাই তা চিবিয়ে খায় এবং কঠিন অংশগুলো ফেলে দেয়।”

জাপানে অবস্থানরত এবং বর্তমানে নাগাসাকি ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত প্রাইমেটোলজিস্ট অধ্যাপক মাইকেল হাফম্যান বলেন, এই বিশেষ ঘটনাটির বিবরণ “অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক”, তবে হাতিরা যে তাদের শাবকদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসা দিয়েছে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে সেই প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন। এজন্য তারা যেসব স্থানীয় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের ক্যামেরা দিয়েছেন যাতে তারা হাতিদের আচরণ ধারণ করতে পারেন।

হাতিরা যেসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে, সেগুলো থেকে তারা নতুন কোনো ওষুধ খুঁজে বের করে ফেলেছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখছেন তারা।

গবেষণাটির আরেক প্রধান গবেষক, হ্যামবার্গের বের্নহার্ড নখট ইনস্টিটিউট ফর ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. ফাবিয়েন শুলৎজ বিবিসি নিউজকে বলেন, “স্থানীয় জ্ঞান আমাদের একটি মানচিত্র দিয়েছে।”

“আমরা (এখন) হাতিদের অনুসরণ করে খুঁজে দেখতে চাই, নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতিতে তারা নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদ বেছে নেয় কি না এবং ওই উদ্ভিদগুলোর প্রাসঙ্গিক জৈবিক কার্যকারিতা রয়েছে কি না।”

প্রাকৃতিক ওষুধের ভাণ্ডার

অনেক প্রাণীই উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে নিজেদের চিকিৎসা করে।
হাতিদের ‘স্ব-চিকিৎসা’ বা নিজে নিজে চিকিৎসা করার বিষয়ে প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিক বর্ণনাগুলোর সন্ধান পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শুরুর দিকে।

রোমান লেখক ক্লডিয়াস এলিয়ান তার গ্রন্থসমগ্র ‘দে ন্যাচুরা এনিমালিয়াম’ (প্রাণীদের প্রকৃতি)-এ এমন এক হাতির কথা বর্ণনা করেছেন, যেটি বর্শা ও তীরের আঘাতে আহত হওয়ার পর একটি জলপাই গাছের ফুল ও তেল খেয়েছিল। পরে সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে।

কয়েক শতাব্দী পর, এই গবেষকেরা এখন বন্যপ্রাণীর কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করছেন যে বনাঞ্চলে বিবর্তন ঘটা এসব প্রাণীদের থেকে সেখানকার উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা কী জানতে পারি।

ড. ফ্রেইম্যান বিবিসি নিউজকে বলেন, “এই গ্রহে এমন কিছু ওষুধ উৎপাদনকারী জীব রয়েছে, যাদের এই অসাধারণ সক্ষমতা আছে। আমাদের চারপাশেই ওষুধের ভাণ্ডার রয়েছে।” 

গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না অধ্যাপক হাফম্যান, তবে তিনি বলেন, “এখন আমরা জানি, মশা ও ড্রোসোফিলা (মাছি) নিজেদের চিকিৎসা করে; মৌমাছিও নিজেদের চিকিৎসা করে, ঠিক যেমনটা করে থাকে বিবর্তনের ধারায় অনেক ওপরের স্তরে থাকা আফ্রিকা ও এশিয়ার গ্রেট এপের বহু প্রজাতিও।”

“প্রতিটি নতুন প্রজাতি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঔষধি অতীত সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পেরেছি।”

ড. ফ্রেইম্যানের মতে, এই গবেষণার ফলাফলে আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও একটি শিক্ষা রয়েছে।

“ফার্মেসি থেকে আমরা যে ওষুধগুলো কিনি, সেগুলোর অনেকগুলোই গাছ, শৈবাল, ছত্রাক ও প্রবালপ্রাচীর থেকে পাওয়া যৌগের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।

“তাই এই বনগুলো রক্ষা করা এবং এসব প্রাকৃতিক ওষুধের ভাণ্ডার টিকিয়ে রাখা আমাদের জন্যই লাভজনক, যাতে ভবিষ্যতে আমরা নতুন প্রাকৃতিক উপাদান আবিষ্কারের জন্য যথেষ্ট সময় পাই, যেগুলো একদিন আমাদের জীবন বাঁচাতে পারবে।”

সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৪:১৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit