ডেস্ক নিউজ : দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরনগরী বুসানের একটি সরু শহরের খালে টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আটকে পড়া একটি বিশাল আকারের হাঙর এখন যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বুসানের নর্থ পোর্ট নালার খালে প্রথম দেখার পর থেকে ‘বুকং-ই’ ডাকনাম পাওয়া সাড়ে ৩ মিটার দৈর্ঘ্যের এই হাঙরটিকে একনজর দেখতে পার্কে অন্তত ৬ লাখ মানুষ ভিড় জমিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শিকারের পিছে ধাওয়া করে সমুদ্র থেকে হাঙরটি ক্যানেলে ঢুকে পড়ার পর আর বের হওয়ার পথ খুঁজে পায়নি। প্রাণীটি ব্রোঞ্জ হোয়েলার জাতের হাঙর হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
রাজধানী সিউল থেকে প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই শহরের কোস্টগার্ড হাঙরটি প্রথম দেখা যাওয়ার দিনই এটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানান যে, জোর জবরদস্তি করলে প্রাণীটির ক্ষতি হতে পারে কিংবা এটি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। সেই পরামর্শে ছয় ঘণ্টার মাথায় অভিযান স্থগিত করা হয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে কোস্টগার্ডের নৌকাগুলো হাঙ্গরটির পেছনে পানির স্প্রে ছড়িয়ে এটিকে খালের মুখের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে অগভীর পানিতে আটকে পড়া একটি গ্রেট হোয়াইট শার্ক উদ্ধারের ঘটনার আদলে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে জানান কর্মকর্তারা।
তবে হেরাল্ড বিজনেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাঙরটি নৌকাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে আবার খালের ভেতরের দিকে চলে যাওয়ায় প্রথম প্রচেষ্টায় তা ব্যর্থ হয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফিশারিজ সায়েন্স জানিয়েছে, হাঙরটি বর্তমানে স্থিতিশীল আছে। কিন্তু বেশি সময় এভাবে আটকে থাকলে এর খাবার গ্রহণ ও নড়াচড়া সীমিত হয়ে পড়ার কারণে প্রাণীটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার বিকেলেও হাঙরটি জলপথ ছেড়ে যেতে রাজি না হওয়ায় উদ্ধার অভিযান আবার স্থগিত করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার উপকূলে অবশ্য হাঙরের দেখা মেলা একদম নতুন কিছু নয়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশের পূর্ব উপকূলে ৪৬টি বড় হাঙ্গরের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হাঙরের শিকারের উপযোগী মাছের সংখ্যা বাড়াকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
নর্থ পোর্ট ওয়াটারফ্রন্ট পার্কে ছুটির দিনগুলোতে সাধারণত দুই হাজারের মতো মানুষের সমাগম হলেও, ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেখানে ৬ লাখ ৭ হাজার দর্শনার্থী এসেছে বলে জানিয়েছে শহর কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার ৬২ বছর বয়সী কিম জং-সুক হাঙ্গরটিকে বিদায় জানাতে এসে মেইল শিনমুন পত্রিকাকে বলেন, কয়েকদিন ধরে দেখার পর প্রাণীটির প্রতি এক ধরনের মায়া পড়ে গেছে, তাই বিদায়ের সময় কিছুটা খারাপই লাগছে।
বুসানের মেয়র চুন জে-সু নিজেও হাঙরটির ভক্ত হয়ে উঠেছেন। সিবিএস রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটির মধ্যে সত্যি এক তারকা গুণ রয়েছে এবং প্রতি পাঁচ থেকে দশ মিনিট পরপর এটি ওপরে ভেসে ওঠে। প্রাণীটি দেখতে সত্যিই দারুণ। শহর কর্তৃপক্ষের এক ইনস্টাগ্রাম পোলে ৯১ শতাংশ মানুষের ইতিবাচক সাড়ার পর হাঙ্গরটিকে বুসানের সম্মানসূচক প্রচারদূত বা ‘শাফ্লুয়েন্সার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হাঙ্গরটির পক্ষে শহরের অফিসিয়াল মাসকট ‘বুগি’ এই সম্মাননা সনদ গ্রহণ করবে।
বাবার সঙ্গে হাঙ্গরটিকে শেষবারের মতো দেখতে আসা আট বছরের শিশু লি দো-ইউন অবশ্য খুব একটা চিন্তিত নয়। সে জানায়, এতে কোনো সমস্যা নেই, বুকং-ই এবার তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কিউএনবি/অনিমা/৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৪:১৩