বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
রাশিয়া, ইরান ও এআই’র হুমকি নিয়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রধানের সতর্কবার্তা ফুসফুসে টিউমার, অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে পোপ লিও রাশিয়া, ইরান ও এআই থেকে যুক্তরাজ্যে হুমকি বাড়ছে: ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রধান হরমুজে আরও এক জাহাজে আগুন আফগানিস্তানে বিবিসি রেডিওর সম্প্রচার স্থগিত করল তালেবান সরকার ট্রাম্পের ছেলের সাবেক বাগদত্তা রাষ্ট্রদূত গিলফয়েলকে পদত্যাগের নির্দেশ যুদ্ধের কারণে গ্যাস রফতানিতে ভাটা, রাজস্ব আয় কমেছে ৪২ শতাংশ ইরানের এক হামলাতেই বিপর্যস্ত হতে পারে বহু দেশের ইন্টারনেট ভারতের গঙ্গায় নৌকাডুবি, শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু ফোনের পর্দায় শিশুর জগৎ, বাইরে খেলা ও পরিবারের সময় কতটা থাকছে

সায়রা জাহান সুপ্তি’র জীবনালেখ্যঃ অচেনা গন্তব্যে

সায়রা জাহান সুপ্তি
  • Update Time : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৫৯ Time View

কলেজে যাওয়ার একটা চেনা রাস্তা আছে। প্রতিদিন ওই পথেই যাওয়া-আসা করি। তো একদিন কী হলো, ভুল করে অন্য একটা বাসে উঠে পড়লাম। উঠার আগে হেল্পারকে জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, এই বাস কি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ যাবে?” হেল্পার এমন ভাব নিল, যেন ফরিদপুর শহরের সব রাস্তার নকশা তার পকেটে। কইলো, “উঠেন আপু, যাবে। একদম যাবে। চিন্তা কইরেন না!” আমিও বিশ্বাস করে উঠে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, এই রাস্তা তো আমার পরিচিত না! কলেজের কোনো নাম-গন্ধ নাই। চারপাশে তাকিয়ে মনে হলো, আমি কলেজে যাওয়ার বাসে উঠছি, নাকি হেল্পারের কথার ওপর ভরসা করে ভাগ্যের লটারিতে উঠছি! শেষে বাস থেকে নামলাম। এক রিকশাওয়ালারে জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ কোনদিকে?” উনি আমার দিকে তাকিয়ে কইলেন, “আপু, আপনি হেল্পারের কথা শুনে এইখানে আইছেন?” কইলাম, “জি।” উনি হেসে কইলেন, “তাইলে তো বুঝছি! হেরা এক জায়গার নাম কইয়া আরেক জায়গায় নামাইয়া দিতে পারে। আগে ভাড়া ঠিক করেন, পরে গন্তব্য খুঁজেন!”

সেদিনের পর থেকে একটা শিক্ষা হইছে, শুধু হেল্পারের মুখের কথা শুনে বাসে উঠতে নাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আজকাল ওই ঘটনা মনে পড়লেই দেশের রাজনীতির কথাও মনে পড়ে। জনগণও যেন একেকজন যাত্রী। সামনে দাঁড়ানো লোকটা মাইকে-মঞ্চে-মুখে বড় বড় কথা কয়, “উঠেন, উঠেন। গন্তব্য ঠিক আছে। সামনে সুন্দর দিন। সব প্ল্যান করা আছে।” জনগণও ভাবে, যেহেতু এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতেছে, নিশ্চয়ই জানে!

বাস ছাড়ে। প্রথমে সব ঠিকঠাক মনে হয়। তারপর একটু পর প্রশ্ন আসে, “মামা, আমরা কই যাইতেছি?” উত্তর আসে, “চিন্তা কইরেন না। আই হ্যাভ এ প্ল্যান!” আবার কিছুদূর যাওয়ার পর প্রশ্ন, “মামা, এই রাস্তা তো চেনা লাগতেছে না!” তখন উত্তর, “উন্নয়নের স্বার্থে একটু ঘুরতে হইব!” আরও কিছুদূর যাওয়ার পর যাত্রী বুঝে, সে যে গন্তব্যের টিকিট কাটছে, বাসটা হয়তো সেই গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছে না!

এদিকে ভাড়া বাড়ে, বাজারের ব্যাগ হালকা হয়, পকেট পাতলা হয়, মানুষের অপেক্ষা লম্বা হয়। কিন্তু হেল্পারের আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নাই। সে বারবার কইতেই থাকে, “আরেকটু সামনে যান, সব ঠিক হইয়া যাবে।” যাত্রী তখন মনে মনে ভাবে, “মামা, সব ঠিক হইব কবে? আর কতদূর গেলে বুঝমু যে আমরা ভুল বাসে উঠছি?”

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বাস ভুল পথে গেলে হেল্পার কিন্তু যাত্রীকে বলে না, “আমি ভুল করছি।” সে বরং নতুন নতুন রাস্তার নাম বানায়, নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেয়, আর যাত্রীকে বোঝায় যে ভুলটা আসলে রাস্তার না, যাত্রীর বোঝার ভুল! যাত্রী যদি বলে, “মামা, আমরা তো ওইদিকে যাওয়ার কথা ছিলাম,” তখন উত্তর আসে, “আপনি বুঝতেছেন না। আমাদের গন্তব্য অনেক বড়। একটু ঘুরে যেতে হচ্ছে!”

এই জায়গাতেই আমার ভয় লাগে। কারণ একটা বাসের হেল্পার ভুল পথে নিলে সর্বোচ্চ কয়েক ঘণ্টা নষ্ট হয়, কিছু টাকা বেশি লাগে, শেষে রিকশা নিয়ে গন্তব্যে যাওয়া যায়। কিন্তু একটা দেশের চালক-হেল্পার মিলে যদি জনগণকে ভুল রুটে তোলে, তখন ভাড়া শুধু টাকা দিয়ে দিতে হয় না। সময় দিয়ে দিতে হয়, সুযোগ দিয়ে দিতে হয়, আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা প্রজন্মকে তার হিসাব দিতে হয়।

তাই এখন কেউ যদি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, “উঠেন, উঠেন। গন্তব্য ঠিক আছে। আমার প্ল্যান আছে,” আমি আর শুধু কথায় বিশ্বাস করব না। আগে জিজ্ঞেস করব, রুট ম্যাপ কই? গন্তব্য কই? ভাড়া কত? আর মাঝপথে নামাইয়া দিলে দায় নেবে কে?

কারণ আমরা আর এমন যাত্রী হতে চাই না, যারা সারাদিন বাসে বসে “গন্তব্য আসতেছে” শুনতে শুনতে শেষে বুঝব, বাস তো অনেক আগেই ভুল রাস্তায় ঢুইকা গেছে!

মাবুদ, আমাদের এমন বুদ্ধি দেন যেন এবার বাসে উঠার আগে হেল্পারের মুখের মিষ্টি কথা না শুনে অন্তত একবার জিজ্ঞেস করতে পারি,
“মামা, কথা কম কন। আগে বলেন, বাসটা আসলে কই যাইতেছে?”

 

লেখিকাঃ সায়রা জাহান সুপ্তি সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ, ফরিদপুর এর অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। জীবন ঘনিষ্ঠ লেখার মাঝে সমকালীন জীবনযাত্রা, রাজনীতির টানাপোড়েন তুলে আনার চেষ্টা করেন। তার লেখার মাঝে জীবনের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়।

 

 

 

 

কিউএনবি/বিপুল/২৫.০৯.২০২৬/রাত ৮.৩০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit