আসাদুজ্জামান আসাদ দিনাজপুর প্রতিনিধি : বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশীয় জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পটি নতুন করে চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে প্রায় দুই দশক আগে এই খনির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। তবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমাতে এবং আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাজ্য ও চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের নতুন রূপরেখা সামনে এসেছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ফুলবাড়ি কয়লা উত্তোলনের ঘোষণার পর গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের এক বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ সম্পর্কে বিস্তারিত পথনকশা পেশ করেন। এতে চলমান জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। ফুলবাড়ি থেকে কয়লা উত্তোলন রয়েছে মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায়।
কয়লা আমদানিতে বছরে ব্যয় হচ্ছে ১৫০ কোটি ডলার। জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে স্থাপিত সাত হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি টন কয়লা বিদেশ থেকে আনতে হয়। ভূতাত্ত্বিক তথ্যমতে, দেশের পাঁচটি খনিতে প্রায় ৭৮০ কোটি টন কয়লার মজুত রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে একমাত্র বড়পুকুরিয়ায় ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে সীমিত উত্তোলন ছাড়া বাকি চারটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতেই সরকার নিজস্ব খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক কয়লা উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান জিসিএম রিসোর্সেস তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলন এবং সেখানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ভূতাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, ফুলবাড়ীতে প্রায় ৫৭ কোটি টন কয়লার মজুত রয়েছে, যেখান থেকে বছরে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টন কয়লা তোলা সম্ভব। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি যুক্ত হবে। এছাড়া পুরো প্রকল্প মেয়াদে কর, রয়্যালটি ও বিভিন্ন ফি বাবদ সরকার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব পাবে এবং অন্তত ১৭ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এদিকে সরকারের এই আগ্রহের জন্য ফুলবাড়ি, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জবাসীর মধ্যে উৎসাহ ক্রমেই বাড়ছে। লোকজন কীভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হবে, কীভাবে পুনর্বাসন করা হবে, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার কী হবে এসব বিষয়ে জানতে চাচ্ছে। অন্যদিকে খনিবিরোধীরাও বসে নেই। এর আগে অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর তাঁরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করেছে। সভা সমাবেশ থেকে ফুলবাড়িতে বাম ঘরানার নেতৃবৃন্দ ঘোষণা দিয়েছেন- যে কোন মুল্যে এই খনি কার্যক্রম ঠেকাতে হবে। তাছাড়া খনির বিপক্ষের যুক্তি হিসাবে প্রাণপ্রকৃতি ধ্বংস হবে, পুরো জেলা এমনকি বাংলাদেশ ধ্বংস হবে, বিদেশি কোম্পানি সব কয়লা বিদেশে পাচার করে দেবে, দেশকে ৬ ভাগ দিয়ে ৯৪ ভাগ নিয়ে যাবে- এরকম বয়ান প্রচার করে চলেছে ।
তবে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোস্যাল মিডিয়ার যুগে এরকম বয়ান খুব কাজ হচ্ছে না। ফলে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ মিছিলগুলোতে বাইরে থেকে লোকজন এনে খুব বেশি জমানো যায়নি। ফুলবাড়িসহ চার উপজেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভাবনায় এগিয়ে যাওয়ারই ইচ্ছে নানাভাবে প্রকাশ করছে স্থানীয় যুবকরা। সোস্যাল মিডিয়ায় পক্ষে বিপক্ষে কাগুজে বিতর্ক লেগেই রয়েছে। তবে ফুলবাড়িতে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ সমাবেশ ফুলবাড়িতে দেখা গেলেও কয়লাক্ষেত্রের বাকি এলাকাগুলোতে প্রতিবাদের নামগন্ধ নেই। শেষ পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্তের আলোকে স্থানীয় জমি মালিকদের কীভাবে সম্পৃক্ত করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৪৪