শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন

সুপার এল নিনো কি, কিভাবে এটা আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে?

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ Time View

ডেস্ক নিউজ : প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক ঘটনা ‘এল নিনো’ এবার আগের সব রেকর্ড ভেঙে অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, দাবানল, ক্ষতিকারক তাপপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও পূর্বাভাস দিয়েছে, এই এল নিনো সংকেতটি আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে তার সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাবে। শিকাগো ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব জানিয়েছে, এই চরম আবহাওয়ার কারণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বিশ্বে চার লাখ ৫১ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

মূলত এল নিনো হলো এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়, যা স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট সময় পর পর ঘটে থাকে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এটি সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়, যখন বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জলভাগ অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে। তবে এবারের এল নিনোটিকে ‘সুপার’ বা অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে অভিহিত করার মূল কারণ হলো মহাসাগরের তাপমাত্রার নজিরবিহীন বৃদ্ধি। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুসারে, চলতি মাসে বিষুবরেখীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫.৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া রেকর্ড রাখার ইতিহাস শুরু হওয়ার পর থেকে যেকোনো এল নিনোর ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রিক বিচ্যুতি। 

সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী যেখানে মাত্র ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেই দুর্বল এল নিনো ধরা হয়, সেখানে এই পরিমাপ চরম পরিস্থিতির নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিকভাবে ডব্লিউএমও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সুপার’ শব্দটি ব্যবহার না করলেও তারা সতর্ক করেছে যে এই ঘটনাটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেবে এবং বৈশ্বিক বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় বিশাল প্রভাব ফেলবে। এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনো এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মিলে ২০২৪ সালকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরে পরিণত করেছিল, যা নেপাল, সুদান, স্পেন ও বলিভিয়াতে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল।

তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে এল নিনো একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা এবং এটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে না। কিন্তু মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের এই উচ্চ ভিত্তি এল নিনোর প্রভাবকে শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার, তীব্র খরা, মুষলধারে বৃষ্টি এবং পরবর্তী অগ্নিকাণ্ড ও ফসলহানির মাত্রা অনেকগুণ বেড়ে যায়। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, চলতি এল নিনোর ফলে যেসব ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে।

ডব্লিউএমও ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এই এল নিনোর যৌথ প্রভাবে ২০২৭ সালটি ইতিহাসের সর্বকালের উষ্ণতম বছর হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব জানিয়েছে, সামনের দিনগুলোতে যে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে, তার মধ্যে নাইজেরিয়াতে ৩১৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৩০০ জন এবং সুদানে ১৭,৬০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা সহ জরুরি প্রতিক্রিয়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে কয়েক হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

সাধারণত এল নিনো চলাকালীন দক্ষিণ দক্ষিণ আমেরিকা এবং মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয় যা মারাত্মক বন্যার সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ব্রাজিলের রিও গ্রান্ডে দো সুল-এ হওয়া বন্যায় ১৮০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চলগুলো তীব্র খরার মুখে পড়ে, যার ফলে কৃষিজ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেস্তে যায়। বিশ্বের শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারত পূর্বাভাস দিয়েছে, এল নিনোজনিত খরা উৎপাদনের ক্ষতি করায় তাদের চাল উৎপাদন ২০০৯-২০১০ মৌসুমের পর এবার সবচেয়ে বেশি হ্রাস পাবে। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, এই এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শুধু সমুদ্র উপকূলেই নয়, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দূরে থাকা ইউরোপের মতো অঞ্চলগুলোতেও এল নিনোর তাণ্ডবে তীব্র তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং একই সাথে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সূত্র: রয়টার্স

কিউএনবি/অনিমা/২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:৪৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit