বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ অপরাহ্ন

মসজিদে হামলার পর আরও তলানিতে পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোহাটে মসজিদে ভয়াবহ হামলা শুধু দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির নাজুকতাই সামনে আনেনি, একই সঙ্গে প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের গভীর সংকটও আরও স্পষ্ট করেছে। সীমান্তপারের জঙ্গি নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তানের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ- সব মিলিয়ে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাটে পুলিশ কমপ্লেক্সের ভেতরের একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি কমপ্লেক্সের দেয়ালে আঘাত করার পর বন্দুকধারীরা সেখানে ঢুকে গুলি চালায়। তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ১৬ জন নিহত ও ৫৭ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। সাত হামলাকারীও পরে নিহত হয়। তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে এপি নিহতের সংখ্যা অন্তত ২১ এবং আহতের সংখ্যা ৮০ বলে জানিয়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে।

হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। পাকিস্তানি তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-টিটিপি হামলার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, দেশটির বিরুদ্ধে হামলা চালানো জঙ্গিরা আফগানিস্তানের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে

দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বর্তমান সংকটকে শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। কারণ, ওই অঞ্চলের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একই সঙ্গে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের সম্পর্ক রয়েছে। এই জটিল নেটওয়ার্কগুলো দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে।

বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। শুরুতে ইসলামাবাদ সীমান্ত বন্ধ, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং আফগানিস্তানে পাকিস্তানি তালেবানের ঘাঁটি লক্ষ্য করে সীমিত সামরিক অভিযানসহ বিভিন্ন চাপ প্রয়োগের কৌশল নেয়। পাকিস্তানের প্রত্যাশা ছিল, কাবুলে তালেবান সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তারা পাকিস্তানবিরোধী টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং আফগান তালেবান ও পাকিস্তানি তালেবানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকায় ইসলামাবাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

আফগান তালেবান ইসলামাবাদ ও টিটিপির মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। কিন্তু টিটিপির বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনাগ্রহী বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। আফগান তালেবানের দৃষ্টিতে টিটিপি মূলত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা; বিপরীতে ইসলামাবাদ মনে করে, আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত টিটিপির কর্মকাণ্ড সরাসরি পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত গড়ায় ‘খোলা যুদ্ধে’

এই বিরোধ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে তালেবান সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরিস্থিতিকে ‘খোলা যুদ্ধ’ পর্যন্ত বলেছিলেন। পরে যুদ্ধবিরতি হলেও সীমান্তে হামলা ও পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেই উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা চালানোর কথা জানায়। পাকিস্তানের দাবি, এসব হামলায় ২৮ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে জাতিসংঘ ও আফগান তালেবান তিন বেসামরিক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। হামলার পর কাবুল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং ‘যথাযথ জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। কোহাটের হামলার কয়েক দিন পর এই বিমান হামলা পরিস্থিতির নতুন করে অবনতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

পুরোনো সম্পর্কের উল্টো ফল

বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তানের নিজের অতীত নীতি। দ্য কনভারসেশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো আফগান তালেবানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ২০২১ সালে তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পাকিস্তানের নেতৃত্বের একাংশ আশা করেছিল, আফগান তালেবান পাকিস্তানি তালেবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। কিন্তু আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দুই গোষ্ঠীর পুরোনো সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য নতুন নিরাপত্তা সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষণটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও সামরিক চাপ আফগান তালেবানের সঙ্গে ইসলামাবাদের আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, জঙ্গি দমন ও রাজনৈতিক সমঝোতার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি

কোহাটের হামলার পর পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দুই দেশ কি জঙ্গি দমনে কোনো কার্যকর সমন্বয়ে পৌঁছাতে পারবে, নাকি সীমান্তপারের হামলা ও সামরিক প্রতিশোধের চক্র আরও বিস্তৃত হবে। বর্তমানে পাকিস্তান টিটিপিসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, আর আফগানিস্তানের তালেবান সরকার নিজ ভূখণ্ডে বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও কার্যক্রম সামলানোর চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে দুই দেশের সরাসরি সামরিক উত্তেজনা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি শুধু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি দুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্কের সংকটে পরিণত হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলা দেখাচ্ছে, কয়েক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পরও সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান হয়নি। বরং জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর পরিবর্তিত কৌশল এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তানের পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

তথ্য সূত্র- দ্য কনভারসেশন।

কিউএনবি/অনিমা/২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:১৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit