আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের তরফ থেকে এই পদক্ষেপকে বলা হচ্ছে তেহরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার এক চূড়ান্ত প্রচেষ্টা বা ইকোনমিক ডি-ডে। নতুন এই মার্কিন কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বজায় রেখে তাদেরকে সহায়তার সুযোগ করে দেবে, তাদের ওপরও নেমে আসবে মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা। এই পরিস্থিতির কারণে চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর পাশাপাশি তেহরানের আঞ্চলিক প্রধান বাণিজ্য সহযোগীরাও এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানের ঝুঁকিতে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ যখন একধরনের স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীগুলোতে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে, ঠিক তখনই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এই নজিরবিহীন ঘোষণা দিল। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন এই বর্ধিত বিধিনিষেধ কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি খাত, সোনা, বিমান পরিবহন এবং শিপিং খাতের ওপরও ব্যাপকভাবে আরোপিত হবে। এ ছাড়াও ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয়, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সাইবার অপারেশনে সহায়তা করার অভিযোগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অন্তত ষাটজন ব্যক্তি, একাধিক কোম্পানি ও বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঘাঁটি রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নের বিস্তারিত কৌশল এখনো কিছুটা অস্পষ্ট থাকলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি ইরানের প্রধান বাণিজ্য সহযোগীদের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। চীনের সামগ্রিক অ-জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয় ইরানের সঙ্গে। এর বাইরেও ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের বড় ক্রেতাই হলো বেইজিং। বিপুল পরিমাণ এই তেল আনুষ্ঠানিকভাবে হিসেব না দেখিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক ডলার ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প উপায়ে এর লেনদেন সম্পন্ন হয়। নতুন এই নিষেধাজ্ঞার পর ওয়াশিংটন চীনা স্বাধীন তেল শোধনাগারের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে। যদিও বেইজিং শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং নিজেদের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
তেহরানের আরেকটি বড় অর্থনৈতিক সহযোগী হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশটি বহু বছর ধরেই ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অবনতি এবং মিসাইল হামলার ঘটনার জের ধরে আমিরাত ও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্কে চরম ফাটল ধরেছে। ফলে আমিরাত ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, দুবাই ভিত্তিক যে সমস্ত দীর্ঘদিনের ছায়া ব্যাংকিং এবং চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান এতদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবেশাধিকার পেত, সেগুলোকে পুরোপুরি বন্ধ করতে আরও কঠোর ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।
এদিকে তুরস্ক, ইরাক ও ভারতের মতো দেশগুলোও এই নতুন সংকটে চরম চাপে পড়েছে। তুরস্ক দীর্ঘদিনের চুক্তির আওতায় ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং বিনিময়ে নিজস্ব তৈরি পণ্য রপ্তানি করে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের গ্যাস আমদানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। একইভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাক তাদের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইরানের গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। যদিও যুদ্ধের প্রভাবে সম্প্রতি দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য কিছুটা থমকে গেছে, কিন্তু নতুন মার্কিন বিধিনিষেধ বাস্তবায়িত হলে ইরাক ও তুরস্ক উভয়ের জন্যই ইরানকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিল পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ শক্তি ভারতও এই উদ্ভূত পরিস্থিতির বাইরে নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সঙ্গে ইরানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কিছুটা কমে প্রধানত চাল, চা, চিনি ও ওষুধ রপ্তানিতে নেমে এসেছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ভারত নতুন করে ইরানের সাথে অপরিশোধিত তেলের আমদানি শুরু করার পদক্ষেপ নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানের পর ভারতের মতো প্রধান তেল শোধনকারী দেশগুলো এবং বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
কিউএনবি/অনিমা/২৫ অগাস্ট ২০২৬,/রাত ১০:০৭